বাংলাদেশ ১১:৩১ রাত বুধ ২৮ অক্টো
যুক্তরাষ্ট্র ০১:৩১ দুপুর বুধ ২৮ অক্টো
যুক্তরাজ্য ০৫:৩১ বিকাল বুধ ২৮ অক্টো
কানাডা ০১:৩১ দুপুর বুধ ২৮ অক্টো
অস্ট্রেলিয়া ০৪:৩১ সকাল বৃহস্পতি ২৯ অক্টো

দুই আনার হিসাব

প্রবন্ধ · Ziaur Rahman Saqlain · ২৪ অক্টোবর ২০২৬

আঠারো আনা!! জীবনের সবকিছুতেই তো ষোলো আনার হিসেব নিকেশ। তো এই অতিরিক্ত দু আনা যোগ হলো যে? তবে কি জীবন খানিকটা বেড়ে গেল? নাকি আমাদের লক্ষ‍্যমাত্রা আমরা নিজেই স্থির করলাম একটু বেশি করে হিসাব করা যাতে অন্তত ষোলো আনায় পৌঁছাতে পারি? এ কৌশলটা অবশ‍্য খারাপ না ! কারণ অলসতার বিদ্রুপটা আমাদের কপালেই জুটে। ঐ যে আমরা বাঙালি! আমরা নাকি ময়ূরের পেখম পরতে চাই কাকের লজ্জা ঢাকতে॥ তো ভাই কাকেরও তো আলাদা পরিচয় আছে। কাকেরও তো একটা আলাদা সৌন্দর্য আছে। কাকের কা কা শব্দেও তো ভোর হয় অনেকের। সেই কাক ও কলসের গল্প মনে আছে? তৃষ্ণার্ত কাক কিন্তু ঠিকই পানি পান করতে পেরেছিলো। তাঁর বুদ্ধি, একাগ্রতা আর পরিশ্রম দিয়ে। এখানেই জীবনের আঠারো আনার হিসাব।

নিজের সত্তা, নিজের অস্তিত্ব, নিজের পরিচয়— এসব কিছুই ধারণ করে চলাটাতেই একজন মানুষকে দেয় পরিপূর্ণতা। জাতি হিসেবে নিজের জায়গাটা পোক্ত করা হয়। জীবনের ঘাত প্রতিঘাত, প্রতিবন্ধকতা, সংগ্রাম, দ্বন্দ্ব কখনো কখনো বিচ‍্যুতি ঘটায় জীবনের গতিতে, ছন্দ হারায় জীবনের কবিতায়। আমরা ভড়কে যাই, শ‍্যাম রাখি না কূল রাখি বিবেচনায় নিজেকে কখনো বিকিয়ে দেই, কখনো সিদ্ধান্তে হই টলমান, কখনোবা উতরেও যাই। এই যে উতরে যাওয়া বা নিজেকে জয়ী করে তোলা অথবা সবকিছু ছাপিয়ে নিজের অস্তিত্বকে যখন জানান দেই সবখানে, তখন মনে হয় ষোলো আনার চেয়ে বেশি অর্জন। মানে আঠারো আনা।

আমরা মানুষ যে কখনোই কোনো কাজে আঠারো আনা অর্জন করিনি তা কিন্তু নয়। প্রত‍্যেকেই কোনো না কোনো মনোবলে, কোনো না কোনো মন্ত্রে, কোনো না কোনো শক্তিতে জীবনের কোনো এক কাজে নিজেকে আঠারো আনায় নিয়ে যেতে পেরেছি। সফলতা বিফলতার চেয়ে বড় জিনিস লক্ষ‍্যে পৌঁছানো।

বিশ্ববাজারে অস্তিত্বের লড়াই যুগে যুগে চলে এসেছে। ইতিহাস সবখানেই সাক্ষী রেখেছে কিছু মহারথীদের মধ‍্য দিয়ে অস্তিত্ব জয়ের গল্পকথা। আমরা প্রত‍্যেকেই আমাদের জীবনে এক একজন সেই মহারথী। প্রত‍্যেকেই সফল হওয়ার দৌড়ে দৌড়াচ্ছি। হয়তো ক্ষেত্র, জীবনের চাহিদা বা চলার পথ আলাদা। আবার কখনো কখনো অনেক সফলতা অনেক অর্জন এসেছে সম্মিলিত প্রয়াসে। এই সম্মিলিতটা তখনই হয় যখন এক জাতি হিসেবে এক মত হিসেবে সবাই সবার বিবেচনায় আসবেন।

জন্মসূত্রে আমরা পেয়ে যাই আমাদের পরিচয়, আমাদের জাতিসত্তা আমাদের ভাষা। এবং সেটা সৃষ্টিকর্তাই নির্ধারণ করে দেন। এবং আমরা সেই পরিচয় নিয়ে পার করি আমাদের চলমান জীবন। আপনার ভাষা এবং জীবনের চলমান প্রক্রিয়া-ই বলে দেবে আপনি কোথাকার! অনেক সময় চেহারা আর ভাষা অথবা জীবনাচারণের তারতম‍্য আমাদের দ্বিধায় রাখে সঠিক পরিচয় পেতে। প্রত‍্যক জাতি, প্রত‍্যেক মানুষ তার ভাষা তার সংস্কৃতিতেই বেশি আপন বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে। এটা শুধু যে কমফোর্ট জোন সেটাও না, এটা বেঁচে থাকার তৃপ্ততা। নিজেকে খুঁজে দেখে খুঁজে পাওয়া। সে কারণেই হয়তো কোনো অচেনা জায়গা বা অচেনা পরিবেশে আমরা আমাদের চেনাজনকেই আগে খুঁজি।

বাঙালি হিসেবে আমরা অন‍্যান‍্য জাতির চেয়ে অধিক মর্যাদার দাবিদার বা একটু বেশি গৌরবান্বিত শুধুমাত্র আমাদের ভাষা আন্দোলন আর মুক্তিযুদ্ধের কারণেই। এ দুটো অধ‍্যায় আমাদের নির্ভীক, আপোষহীন আর সাহসিকতার পরিচয়কে তুলে ধরে। এবং এই সংগ্রাম এই সহনশীলতার কারণেই মনে হয় আমাদের বাঙালিদের জীবন ষোলো আনা নয় অনেক ক্ষেত্রেই আঠারো আনা। বিশেষ করে যারা ভিন দেশে এসে নিজের ভাষার নিজের সংস্কৃতি নিজের পরিচয়ের একটা জায়গা করে নেন অধ‍্যবসায়ের হাত ধরে।

এটা অনেকটা ভাষা আন্দোলনের অবয়ব, অনেকটা স্বাধীন থাকার গল্প।

বাংলাদেশ ছেড়ে যারা অন‍্যান‍্য দেশে গিয়ে নিজেদের পরিচয়কে ধরে রেখে নিজের সংস্কৃতিকে লালন করে নিজের পতাকার একটা বিশেষ জায়গা করছেন তারা আসলেই যোদ্ধা। সম্পূর্ণ উল্টো হাওয়ার ধাক্কাকে সামলে নিজের অস্তিত্বকে জানান দেওয়া এতো সহজ না। ভিন দেশে ভিন ভাষাভাষীদের সাথে সম্পর্ক রেখে নিজের পরবর্তী প্রজন্মদের সাথে পূর্ববর্তী প্রজন্মের একটা যোগাযোগ রাখা বা সেই কাজ চালিয়ে নিতে তদারকি করা কতোটা অসহজ তা শুধু প্রবাসীরাই জানে।

আমি আমার কথাই বলি বা আমার দেখা থেকেই যদি অভিজ্ঞতা বর্ণনা করি তাহলে নির্দ্বিধায় বলতে পারি আমরা আঠারো আনাই বাঙালি। কারণ ষোলো আনা বাংলাদেশিরা বাংলাদেশে যা করেন না আমরা এই বিলেতে তার চেয়েও বেশি করি। বাঙালি পরিচয় তো অবশ‍্যই নিজের মুখের ভাষায়, সেই সাথে পোশাক আশাক, প্রতিদিনকার খাদ‍্যাভাস প্রতিদিনকার যাপিত জীবন নিয়েই নিজেকে বাঙালি হিসেবে ধরে রাখা। এবং এই বাঙালি পরিচয়টা আজ এই বিলেতে কতোটা শক্ত হয়েছে তা আমরা প্রতিনিয়ত টের পাই। শুধু যে জনবসতি ঘন হয়েছে বাঙালি পাড়ায় সেটাও না। আজ ঘরে ঘরে বিরিয়ানির চেয়েও ভর্তার গন্ধটাই বেশি পাওয়া যায়। বিদেশি পোশাকের আলমারির তাকে অনেকটাই আজ জায়গা করেছে আমাদের জামদানি আর তাঁত। এটা কিন্তু একদিনের গল্প নয়। এটা শুরু হয়েছে যখন থেকে বাংলাদেশিরা এই বিলেতে নিজেদের আবাস গড়ে তুলছেন তখন থেকে।

আজ বিলেতে অনেকগুলো বাংলা সাংস্কৃতিক সংগঠন। অনেকগুলো নাটকের সংগঠন। অনেকগুলো বাংলা গানের স্কুল। অনেক অনেক বাংলাদেশি খাবারের রেস্তোরাঁ। প্রতিদিন বাড্‌ছে বাংলাদেশি কাপড়ের দোকান। সুতরাং সবাই সবার জায়গা থেকে চেষ্টা করছে, কোনো না কোনোভাবে দেশের সংস্কৃতি ঐতিহ্যের সাথে চলতে। এর বিপরীতেও যে লোক নেই সেটাও বলছি না। এবং এরা আমাদের দেশেরই মানুষ যারা বাংলা পরিচয়ের চাইতেও নিজেদের বিদেশি বলতে বেশি পছন্দ করে। তারা শাড়ি পাঞ্জাবি পরাটা আনস্মার্ট মনে করে, দেশি খাবারের স্বাদে তাদের অরুচি, তারা বিদেশি গান শোনাতে অধিক মনোযোগী এমনকি এরা তাদের ছেলে-মেয়েদের বিদেশি কায়দায় গড়ে তুলতে চায়। এটা এদের দোষ না গুণ সেই বিচারে যেতে চাই না। কে কার প্রজন্মকে কীভাবে বড় করবে বা কীভাবে দেখতে চায় সেটা সম্পূর্ণই তার ইচ্ছা।

বাঙালি হিসেবে কেউ যদি তাকে দেখতে না চায় বা কেউ যদি অন‍্য দেশের সংস্কৃতিকে অন‍্য দেশের ভাষায় তার পরিবারকে রাখতে চায় সেটা সে করতেই পারে, সে বিবেচনা তার। একজন বাঙালি হিসেবে আমি হয়তো তাকে বোঝাতে পারি বা তার প্রজন্মের প্রতি দায়বদ্ধতার কথাটাই বলতে পারি।

একবার এক বাংলাদেশির আকুল কান্নায় আমি ভেসে গিয়েছিলাম। বাংলা বলতে না পারার কষ্টে সে যে মর্মবেদনায় ছিলো তাতে ব‍্যাথিত হয়েছিলাম। ঘটনাটা এখন থেকে প্রায় তিন বছর আগের কথা। বাংলায় কথা বলি নামে আমি একটা অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করতাম। এ অনুষ্ঠানের উদ্দেশ‍্য ছিলো বিলেতে বাংলা চর্চাকে জাগিয়ে রাখা বা সচল রাখা। নতুন প্রজন্মকে এই চর্চায় শরিক করা।

যাই হোক অনুষ্ঠানের মাঝখানে কলটা আসে। ধরতেই ওপাশ থেকে কান্নার শব্দ। উনি অনেক কষ্টে বললেন যে তিন মাস পর উনি আমাদের এই অনুষ্ঠানের মারফত বাংলা শুনলেন। আমি জানি না এই আধুনিক যুগে এসে হয়তো আপনি বা আমার কাছে উনার কথাটা একটু বেশি আবেগি মনে হবে। উনি আয়ারল‍্যান্ড থাকেন এবং উনার আশেপাশে কোথাও বাংলাদেশি মানুষ নাই। নতুন এসেছেন বলে আশেপাশে কোথাও যেতে পারেন না। স্বামী বাংলাদেশি হলেও বাংলা বলতে কেন জানি অনভ‍্যস্থ। তাই রিমোট ঘুরাতে ঘুরাতে হঠাৎ করেই আমাদের চ‍্যানেলে চোখ আটকে যায়। এবং সাথে সাথেই ফোন করে কথা বলেন।

আমি তাঁর অনুভূতির আবেগটা ঐ সময় বুঝতে পারছিলাম। উনার কথা শুনে মনে হয়েছিলো প্রাণ ফিরে পেয়েছেন। আমি তখনই 'বাংলায় কথা বলি' অনুষ্ঠানের সার্থকতাটা অনুভব করলাম। এই যে একটা মানুষের বাংলা বলার আকুতি এটাকে কি অস্বীকার করা যায়?

আমার ধারণা বিশ্বের সব ভাষাভাষী মানুষের অনুভূতি আবেগ একই রকম তার নিজস্ব সংস্কৃতির নিজস্ব আচারের প্রতি। যে কারণে কখনোই কোনো চীন দেশের লোক বা ইউরোপিয়ানকে নিজেদের মধ‍্যে তাদের ভাষায় ছাড়া অন‍্য কোনো ভাষায় কথা বলতে দেখেনি। এমনকি ইতালিয়ান বা ফরাসিদেরও দেখেছি তারা নিজেদের ভাষা বাদ দিয়ে অন‍্য ভাষা শিখতে তারা অনাগ্রহী।

‘বাংলায় কথা বলি’ অনুষ্ঠান মারফত অনেক অভিজ্ঞতার সাথে পরিচয় ঘটেছে। ভালো মন্দ দুটোই। কখনো দেখেছি বাবা, মায়েদের ভীষণ আগ্রহ থাকা সত্ত্বেও সন্তানদের বাংলা বলাতে পারছেন না। কষ্ট করে ছোটবেলাতে করালেও বড় হয়ে আর পারছেন না। আবার কখনো দেখেছি সন্তানদের কাছে এই বাংলা বলার প্রয়োজনীয়তাও কেউ বুঝিয়ে দেননি। যে কারণে বাঙালি পরিবারের সন্তান হওয়ার পরও তার কাছে বাংলা শুধুই একটা ভিনদেশি ভাষা। কোনো কোনো পিতামাতা আবার ছোটবেলাতেই শিশুদের বাংলা বলাতে অনাগ্রহী যদি তার ইংরেজি বলার কায়দায় বাংলার কোনো প্রভাব পড়ে? নিজের সন্তানের বাংলাটা যদি ইংরেজদের মতো হয় তাতে তাদের কোনোই আপত্তি নেই।

একবার ‘বাংলায় কথা বলি’র একটি পর্বে অনুষ্ঠান শুরুর আগে এক শিশু অতিথিকে দেখলাম একটা বাংলা বই খুব মনোযোগ দিয়ে দেখছে। আমি খুব অবাক হয়ে বললাম তুমি কি বাংলা পড়তে জানো? সে মন খারাপ করে জানালো সে বাংলা পড্‌তে জানে না। সে দেখছে বাংলা বর্ণমালা কেমন হয়। সে খুব আক্ষেপ করে বললো তাকে কখনোই বাংলা শেখানো হয়নি অথচ তার খুব ইচ্ছা বাংলা শেখার। ওর কাছে বাংলা ভিনদেশি ভাষা।

উল্টো চিত্রও প্রচুর আমরা দেখেছি। সারাদিন কাজ করার পরও অনেক পিতামাতা তার সন্তানদের বাংলায় গড়ে তুলবেন বলে ছুটছেন বিভিন্ন জায়গায়। কখনো আবৃত্তি শেখাতে, কখনো বাংলা গান শেখাতে, কখনো কোনো মহড়ায়। শিশুরাও পিতামাতার ইচ্ছা পূরণ করতে নিজেদের পরিচয় বাঁচিয়ে রাখতে নিজেদের পড়াশোনার পাশাপাশি আপ্রাণ চেষ্টা করছে যাতে বাঙালি হয়ে উঠতে পারে। যেখানে বাংলাদেশের শিশুরা বাংলা শিখতে নাকি আজকাল ক্লাবে বাংলা ক্লাস করে। অদ্ভুত তো বটেই !

এই যে বিলেতের বাংলাদেশিদের বাঙালি হয়ে ওঠার সংগ্রাম, এটা যে শুধু নিজেদের পরিচয় বাঁচিয়ে রাখতে, তা কিন্তু নয়। দেশের সাথে যোগাযোগ স্থাপন করতে, দেশের মানুষের সাথে এখানকার প্রজন্মদের যেন জানাশোনা থাকে, স্পর্শ থাকে সেটাও একটা ব‍্যাপার।

কতো বয়োজ্যেষ্ঠদের আফসোস শুনেছি, নাতি নাতনির সাথে কথা বলতে না পারা, তাদের সময় কাটানোর আফসোস। ঘরের মধ‍্যে সবাই থাকেন একসাথে, তারপরও সবাই ব‍্যস্ত নিজ নিজ ভুবনে। এটার একমাত্র কারণ বাঙালি কমিউনিকেশনের অভাব।

নির্মম হলেও এটাই সত‍্য কোনো দেশই বাইরের দেশের লোককে কখনোই তার দেশের নাগরিক ভাববে না। একটা আড়াল সবসময় থেকে যাবে। একটা সীমারেখা কিছু দিন পর পর জানান দেবে আপনি অন‍্য দেশের লোক। আমি আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলাকেও সাধুবাদ জানাই। এটাও শিকড়ের সাথে জড়িয়ে রাখে নিজেকে। বিলেতের সিলেটি কমিউনিটিতে ভাবটা খুব প্রবল। বেশিরভাগই যেহেতু অনেক আগে এদেশে আসা সেকারণেই তাদের তিন চার প্রজন্মের জন্ম এদেশেই। তারপরও নিজেদের বাঙালিত্ব প্রতিটি পরিবার ধরে রেখেছে। হয়তো প্রমিত ভাষাটা প্রচণ্ড রকম অনুপস্থিত কিন্তু আঞ্চলিক ভাষাটা ব‍্যহবার হয় সবসময়। বাঙালিয়ানা ভোজনে, বিভিন্ন আচার অনুষ্ঠানে দেখা যায়।

আমি পশ্চিম বাংলার বিভিন্ন লোকদের দেখেছি আফসোস করতে তাদের সন্তানদের নিয়ে। এবং তারা খুব আনন্দের সাথে আমাদের সন্তানদের বাংলা বলার অভ‍্যাসটাকে সাধুবাদ জানায়। পশ্চিম বাংলার লোকজন যারা এখানে বসবাস করে তাদের বেশিরভাগ পরিবারেই আটপৌরে ভাষাটা ইংরেজি। সন্তানদের পাশাপাশি বাবা মায়েরা ইংরেজিটা ঝালিয়ে নেন। এদিক থেকে বাংলাদেশের পিতামাতারা অনেক সচেতন। বেশিরভাগ পরিবারেই বাবা মায়েরা সন্তানদের সাথে বাংলাতেই কথোপকথন সারেন। তাতে করে আমাদের বাচ্চাদের বাংলা শোনাটা হয় অনেক বেশি। বাচ্চাদের অভ‍্যাসগতভাবে বা পড়াশোনার ক্ষেত্র ইংরেজি হওয়াতে চর্চাটা বেশি ইংরেজি হয়। তবে অনেক বাবা-মা-ই তাদের সন্তানের মাতৃভাষা ইংরেজি মনে করেন যেহেতু তার জন্ম এদেশে। এবং এই একটা কারণেই তারা ঢিল দেন বলে একসময় হাল ছেড়ে দেন।

বাঙালি হওয়ার বা বাঙালি হয়ে থাকার যে যুদ্ধ প্রতিদিন আমাদের করতে হয় এই বিলেত বাড়িতে তা একমাত্র আমরাই বুঝতে পারি। নিজেদের সংস্কৃতি ঐতিহ‍্যকে ধরে রাখতে এবং পরবর্তী প্রজন্ম যাতে আমাদের জাতীয় দিবসগুলো জানতে পারে, আমাদের বাঙালি হওয়ার গল্প যাতে মনে রাখে তার জন‍্য বিলেতের সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো কী পরিমাণ সময়, শ্রম, অর্থ ব্যয় করে সেটা বলে বা লিখে বোঝানো যায় না। বইমেলা থেকে শুরু করে জাতীয় দিবস উদযাপন, পিঠা উৎসব, বসন্ত উৎসব, শারদ উৎসব এমনকি প্রভাত ফেরিরও আয়োজন হয়। এতে করে বাঙালি কমিউনিটি যেমন শক্তপোক্ত হচ্ছে ঠিক তেমনি করে আমাদের বাঙালিয়ানার ইতিহাস রচিত হচ্ছে। আবহাওয়ার বৈরিতা দৈনন্দিন জীবনের ঝক্কি ঝামেলাকে সাথে করে চলে আয়োজন। এসব কিছুর একমাত্র উদ্দেশ্য হলো নিজেদের পরিচয়টাকে এই মাল্টিকালচারের দেশে প্রতিস্থাপন করা, নিজেদের সত্তাকে জাগিয়ে রাখা। এবং আমি দেখেছি যে প্রতিটি দেশের অধিবাসীরা যারা এই বিলেতে বসবাস করেন তারাও তাদের ঐতিহ‍্য তাদের সংস্কৃতি তাদের মতো করে আয়োজন করে। এটাই তো একটা জাতির বৈশিষ্ট্য।

বিভিন্ন উপায়ে বিভিন্ন আচারে এখানে বাঙালি হওয়ার গল্প লেখা হয়। কখনো কবিতা উৎসবে বা কখনো বাংলা নাট‍্যোৎসবে। ভাবা যায়, এই বিলেতে বাংলা নাট‍্যোৎসবের বয়স ২২ বছর! এবং এই উৎসবে পুরো যুক্তরাজ‍্যের বিভিন্ন নাট‍্য সংগঠন যোগ দেয়। তার মানে কতো লোক এখানে জড়িত! মঞ্চে একটা নাটক নিয়ে আসতে কতোটা সময় ব‍্যয় হয় বা কতোটা ধৈর্য‍্যের প্রয়োজন সেটা ভাবনার অতীত!

এই ইংরেজ দেশে চাইলে তো ইংরেজি নাটকও করা যেতো বা যায়! তাহলে বাংলা কেন? এটা শুধুমাত্র বাঙালি হওয়ার গর্বে, বাঙালি পরিচয়ের আনন্দে।

২০০৮ সালে আমি যখন আসি তখন ভাবনাতেই ছিলো না এই বিলেতে বাংলা খবরের কাগজ দেখবো। আমি খুব আশ্চর্য হয়েছি বাংলা খবরের কাগজ দেখে। যখন হাতে নিয়েছিলাম বাংলা শব্দ বাংলা বাক‍্যগুলো দেখে আমার চোখ ভেসেছিলো আনন্দ আর ব‍্যথায়। আনন্দ পেয়েছিলাম ভিনদেশে আমার ভাষাকে দেখতে পেয়ে, ব‍্যখা পেয়েছিলাম দেশ থেকে দূরে আছি বলে। এবং আমি খোঁজ নিয়ে দেখলাম অনেকগুলো খবরের কাগজ বাংলায় এখানে পাওয়া যায় একদমই বিনামূল্যে। এই যে যারা এ কাজে নিয়োজিত এটা নিশ্চয়ই শুধু ব্যাবসা নয়? যে পরিমাণ শ্রম, মেধার প্রয়োজন একটা পত্রিকা বের করতে! এবং এই অলাভজনক কাজে এতোটা সময় দেওয়ার নেপথ্যে অবশ‍্যই বাঙালি হওয়ার আবেগ কাজ করেছে। নিজেদের ভাষাকে প্রতিষ্ঠিত করার, ভিনদেশিদের সাথে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার সাহস যে যোদ্ধারা করেছেন এবং এখনো করছেন, তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানানো আমাদের সবার দায়িত্ব। বাংলা বাঁচিয়ে রাখার দায়িত্বে তাদের এই বাঙালিয়ানা তো আঠারো আনার হিসাব।

হাসপাতালের লিফটে যখন বাংলায় নির্দেশনা শুনি, অথবা বিলেতের রাস্তা যখন বাংলায় নামকরণ হয় তখন সেই গর্বটা একজন বাঙালিরই পাওনা। অথবা এই বিলেতে একটা টিউবস্টেশন যদি বাংলাতেই লিখা হয় তখন অবশ‍্যই বুঝতে হবে বিলেতের বাংলাদেশিরা আঠারো আনাই বাঙালি।

কারণ বাঙালিয়ানার আবেগটা সেই পরিমাণ না হলে এ লড়াই সম্ভব না।

শেষ করব ছোট্ট একটা ঘটনা দিয়ে।

যে রাতে আমি লন্ডনে আসি, এক বন্ধুর বাসায় উঠেছিলাম। ওর বাসায় আর কেউ নেই। পরের দিন থেকে বন্ধুটি কাজে চলে যায়, আমি সারাদিন বাসায়। তিনদিনের মাথায় যখন হাঁসফাঁস লাগছিলো তখন সাহস করে বাইরে গেলাম বিকেল বেলা। বাসার পাশেই একটা স্থানীয় পার্ক।

তখন শীতকাল শুরু হবে হবে, প্রকৃতিতে এমনই একটা ভাব। শুনশান নীরবতা। কোথাও কেউ নেই। হঠাৎ একটা গালি বা বকা শুনে আমি চমকে উঠলাম। বিলেতে এসে প্রথম বাংলা শুনলাম। ঘুরে দেখলাম একজন মা তার বাচ্চাকে জোরে জোরে বকা দিচ্ছে মানে গালি। ঐ সময়টাতে ঐ গালিটাও আমার কাছে এতো মধুর লেগেছিলো ! যেহেতু বাংলা শুনেছি!

আহারে বাংলা! আহা!
Promitee
Promitee

Helpful

২৮ অক্টোবর ২০২৬
Abc

nice

২৮ অক্টোবর ২০২৬

পয়েন্ট পরে ইভেন্ট টিকিট ও অন্যান্য পুরস্কারে ব্যবহার করা যাবে।