এক
পহেলা মাঘ, ১৪৩০। দক্ষিণ বাংলার শ্যামনগরের জেলেপল্লিতে শুরু হয়েছে লোকসংষ্কৃতির একটি উপাচার মা বনবিবি পূজা। এই পূজায় প্রধান, মা বনবিবি। গত একটি বছর ধরে মণ্ডপে দাঁড়িয়ে থাকা মাকে নৌকায় তুলে গভীর জঙ্গলে নিয়ে যাচ্ছে গ্রামের পাঁচ ছয়জন পুরুষ। সেখানে বিসর্জন দিয়ে আসা হবে পুরাতন মাকে। পাশাপাশি মণ্ডপে বসানো হচ্ছে নতুন মা বনবিবিকে। নৌকা নিয়ে মানুষগুলো ফিরে আসলেই আরম্ভ হবে উপাসনা। জেলেপল্লির মেয়ে, ছেলে, বুড়ো, খোঁড়া, রোগগ্রস্ত, পাগল, আধ পাগল-মোটকথা পল্লীর অপয়া কয়েকশত বিধবাগুলো ছাড়া বাকি সবাই মণ্ডপের চারপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। রাধারানী, শুক্লা আর পরেশ মণ্ডপের জন্য লেপে রাখা জায়গাটুকুতে দাঁড়িয়ে অতি সতর্কতায় বসাচ্ছে একে একে শাহ জঙ্গলি, ধনা, মনা, গাজী কালু, দুঃখে, সুন্দরবনের বাঘের মূর্তি দক্ষিণ রায় আর এদের সবার মধ্যখানে মা বনবিবিকে। মণ্ডপের সামনে গতরাতে পুঁতে দেওয়া কলাগাছ দুটির একটি খানিকটা কাত হয়ে পড়েছে লক্ষ্য করে রাধারানী চেঁচিয়ে ওঠে, এই যে শ্যামল মিয়াভাই, কলাগাছ তো বাঁকা হয়েছে। কী অলক্ষুনে কথা!
মধ্যবয়সি মৌয়াল শ্যামলের গায়ে শীত সকালেও শুধু একটা স্যান্ডো গেঞ্জি। গালের ডান পাশে আর উদোম দুই হাতের কয়েকটি স্থানে ছোট বড় খাবলা খাবলা গর্ত। কয়েক বছর আগে বনের ভেতরে মধু সংগ্রহ করতে গিয়ে বাঘের শিকার হয়ে হয়েছিলো সে। মরে যাওয়ারই কথা ছিলো, কিন্তু মা বনবিবির কৃপায় প্রাণ নিয়ে ফিরে এসেছে। শুক্লার কথা শুনে কলা গাছের দিকে তাকিয়ে দেখে সত্যি ওটা পুব দিকে বাঁকা হয়ে আছে। দুই হাতে দুই কান ছুঁয়ে জিভে কামড় দিয়ে শ্যামল বলে, সহায় সহায় মা বনবিবি, বাঁচাও আমাদের তুমি। কলা গাছ দুইহাতে জড়িয়ে ধরে সোজা করে দিলো। কিছুক্ষণ পর বললো, বেলা বেড়ে যাচ্ছে, নৌকা নিয়ে তারা ফিরলো বলে, পুথি পাঠ আরম্ভ হবে, আশা করছি এই বচ্ছর মায়ের কৃপায় আমাদের গ্রামে কোনো বাপের ব্যাটা বাঘের পেটে খাবার হবে না।
রাধারানীর স্বামী চরণ সর্দার আগে কৃষিকাজ করতো। কিন্তু একসময় কৃষি জমিতে লবণ পানি তুলে চিংড়ি চাষ আরম্ভ হলে ধীরে ধীরে চিংড়ির ঘের বাড়তে থাকে। কাজ হারায় চরণ। সেই থেকে সে সুন্দরবনে যায় মাছ ধরতে। রাধারানীর বুক কাঁপে ভয়ে, স্বামীকে জঙ্গলে পাঠাতে ইচ্ছে করে না। কিন্তু পেটের ক্ষুধা মাঘের কুয়াশায় লুকিয়ে থাকা অজানা রাক্ষসের ভয়ের চেয়েও ভয়ংকর। তাই যেতে দিতে হয় স্বামীকে। তবুও তার কানে বাজে বিধবা আন্দরি বালার বিলাপ ধ্বনি— বাপেরেও খেলো বাঘে, ভাইয়েরও খেলো বাঘে, স্বামীরেও খেলো বাঘে!
না, এতো ভয় পেলে চলবে না রাধারানীর। পেটে দানা পানির জোগান দিতে হবে আর কোলের ওপর বড় হচ্ছে যে সন্তান, তার জন্যেও তো ভাবতে হবে। মণ্ডপে মূর্তি বসানো আর সাজসজ্জার বাদবাকি কাজ শেষ হবার আগেই পুরুষ লোকগুলো হইহই করে নৌকা ঘাটে লাগিয়েছে। মা বনবিবিকে জঙ্গলের গভীরে বিসর্জন দিয়ে আরম্ভ হয়েছে নতুন মায়ের উপাসনা। ঢাকের শব্দ, উলু ধ্বনি, উৎফুল্ল মানুষের নাচ আর কলকল হাস্যরসে জেলেপাড়া মুখরিত থাকবে আগামী ছয় দিন।
রাধারানীর ছেলের বয়স এক মাস। ওর স্বামী চরণ যাবে সুন্দরবনে মাছ ধরতে। গ্রামের আরো কয়েকজন পুরুষ একসাথে যাবে। তাদের কেউ বাওয়াল- যাবে গোলপাতা কাটতে, কেউ মৌয়াল- যাবে মধু আহরণ করতে, আর কেউ চরণের মতো জেলে- যাবে মাছ আর কাঁকড়া ধরতে। রাতে কুঁজো বুড়ির মতো গুটিয়ে থাকা কালো আর তেলচিটচিটে কুপির চারপাশে জাঁকিয়ে বসা ফ্যাকাশে অন্ধকারে ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদে সে। চরণ বলে, কান্দো কেনো রাধা?
শাড়ির আঁচলে চোখের জল মুছে রাধারানী বলে, আমার ভয় লাগছে, জাদু যদি তোমারে আর দেখতে না পায় কোনোদিন!
কথা শেষ করেই মুখে হাত চাপা দিলো সে। টুকরো করে একটা কামড় দেয় জিভে, হায় মা বনবিবি, ক্ষমা করে দাও। এ আমি কী কথা উচ্চারণ করে ফেললাম!
স্ত্রীর আক্ষেপ দেখে মুচকি হাসে চারণ। বলে, ধুর, কিচ্ছু হবে না। খামোখা ভয় পাস তুই।
তবু, স্ত্রীর বুক কাঁপে স্বামী হারানোর ভয়ে। জানে, এই মুহূর্তে শত কাঁদলেও সকালে নিজ হাতেই সে এগিয়ে দেবে স্বামীর ধুতি আর একটিমাত্র পরিষ্কার শার্ট। ঘুমানোর আগে চরণ রাধারানীকে একটু বেশি সোহাগ করলো আজ। সোহাগের উষ্ণতায় রাধারানী টের পায় তার মনের মধ্যে বিনিদ্র জেগে আছে যে ভয়ের দানব, সেটা চরণকেও আতঙ্কে রেখেছে। যদিও চরণ মুখে বলে ভিন্ন কথা। রাধাকে শোনাতে নাকি নিজেকেই শোনাতে বললো, মদ্যি মদ্যি আমার বাঘ দেখলে ভয় করে নারে রাধা, বাঘ আমারে খাবে না আমি জানি।
পরদিন সকালে পান্তা আর বাসি তরকারি খেয়ে বনের উদ্দেশ্যে যাত্রা করে চরণ। চরণের সঙ্গে রওনা দিয়েছে রমিজ ও সনাতন। রাধারানীর মতো বাকি দুই বৌ-ও পথের পাশে দাঁড়িয়ে থাকল যতক্ষণ তাদের পুরুষদেরকে হেঁটে যেতে দেখা যায় জঙ্গলের দিকে। সদ্য বিবাহিতা শাহিদা খাতুন জিজ্ঞেস করে, তারা কতোদিন জঙ্গলে থাকবে বুবু?
পাশের একজন উত্তর দেয়, এই ধরো গিয়ে চাইর পাঁচ দিন। ডরাও না, তোমার স্বামী এইবার একটা শক্তিমান বাঘ হয়ে তোমারে আঁচলে ফিরে আসবে। ঠাট্টা করতে ছাড়ে না উত্তরদাতা মহিলা।
হুম। আসবেই তো। নিশ্চয় আসবে। লাল হয়ে ওঠা গালে বিড়বিড় করে সলজ্জ কণ্ঠে বলে শাহিদা।
দলের মধ্যে সবচেয়ে বয়স্কা বুলি দাসী রাধারানীকে ধমকের সুরে শাসায়। বলে, এই যে রাধারানী, মাথার চুল এমন বাতাসে নাচিয়ে বেড়াচ্ছ যে খুব। জানো না এতে বাঘের চোখ তোমার স্বামীর দিকে পড়বে সবার আগে?
বুলি দাসীর কথা শেষ হবার আগেই দ্রুত হাতে চুলে খোঁপার গিঁট আটে রাধারানী। শাড়ির আঁচল তুলে মাথার চুল যতখানি সম্ভব ঢেকে ফেললো। এরপর অকারণ ভয়ার্ত চোখে একবার তাকালো চারপাশে। বাকিরা ততোক্ষণে হাঁটতে আরম্ভ করেছে বাড়ির দিকে। আগামী কয়েক দিন কেমন দুশ্চিন্তায় কাটবে সেই গল্প করতে করতে তিন নারীর দলটি পথ হাঁটতে আরম্ভ করেছে। বুলি দাসী সমস্ত নিয়ম কানুনের কথা বারবার করে মনে করিয়ে দিতে থাকে অপেক্ষাকৃত অল্পবয়সি শাহিদা আর রাধারানীকে। বলে, যতদিন স্বামী ফিরে না আসছে ততোদিন তোমরা মাথার চুল আঁচড়াতে পারবে না। শরীরে আর চুলে তেল দিতে পারবে না। স্বামী যতদিন জঙ্গলে থাকবে ততোদিন খোলা চুলে চলাফেরা করা একদম মানা।
বুলি দাসীর প্রতিটি কথায় ঘাড় নেড়ে সম্মতি জানায় ওরা, কিরা কসম কেটে বলে অক্ষরে অক্ষরে পালন করবে সমস্ত নিয়ম কানুন। তবু বনে যাওয়া মানুষগুলো যেন জ্যান্ত ফিরে আসে, মনে মনে মন্ত্র পাঠ আর সূরা পাঠের মতো প্রার্থনা করতে থাকে তারা সবাই।
শাহিদাকে ওর বাড়ির উঠোন থেকে বিদায় জানানোর সময় বুলি দাসী আরো বলে, গোসল কইরলে শরীরে আবার সাবান মাখাইতে যায়ো না যেন। সাবান মাখা নিষেধ আছে। আর কোনো স্নো পাউডারও না এই কয়দিন। মনে থাকবে?
মাথা নাড়ে শাহিদা, ঠিক আছে, বুঝেছি, মনে থাকবে।
বাড়ি ফিরে রাধারানী শ্বাশুড়ির কাছ থেকে ছেলেকে কোলে তুলে নেয়। বাচ্চাটা বেশিরভাগ সময় ঘুমিয়েই থাকে। ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে রাধারানীর চোখ ভরে জল আসে। যদিও জেলেপল্লির স্বাভাবিক নিয়ম এটা, বাড়ির পুরুষেরা বনে যাবে রোজগারের ব্যবস্থা করতে। সবাই যায়। আর তাদের অনেকেই আর কোনোদিন ফিরে আসে না। কারো কারো রক্তমাখা মৃত দেহাবশেষ খুঁজে পাওয়া যায়, কেউ কেউ পুরোটাই নিশ্চিহ্ন হয়ে যায় বনের রাজার পেটে। দীর্ঘশ্বাস ফেলে রাধারানী ছেলেকে পুরোনো শাড়ি দিয়ে বানানো ছিক্কায় শুইয়ে রেখে পুকুর থেকে দুটো ডুব দিয়ে এলো। স্বামী বাড়ি না থাকলেও রাধারানীর পেটে ভীষণ খিদে মোচড় দিয়ে উঠছে। শাশুড়িকে না ডেকেই পাকের ঘরে গিয়ে ভাত খেতে বসে গেলো। বুকের দুধের বাচ্চা আছে তার, পেটে ভয়ংকর ক্ষুধার ছোবল। মাটির সরায় ঢাকনা দিয়ে রাখা পুটি মাছ ভাজা দেখে তার মন খুশিতে ঝলমলিয়ে ওঠে। একটা প্লেটে ভাত আর দুটি ভাজা মাছ নিয়ে খেতে গিয়ে মনে হলো সাথে দুটো শুকনো মরিচ পোড়া হলে বেশ হতো। মাটির চুলায় কয়লাগুলো এখনো লাল হয়ে আছে। একটা তাওয়ায় দুটো শুকনো মরিচ ফেলে নাড়তে থাকা অবস্থায় গন্ধে ছুটে এলো ওর শাশুড়ি। এক ঝটকায় চুলার উপর থেকে গরম তাওয়া ছুড়ে ফেললো। চমকে ওঠে রাধারানী। বুঝে পায় না কী এমন অপরাধ করেছে সে! শাশুড়ি রাগে চিৎকার করে ওঠে। বলে, অলক্ষুনে অপয়া কোথাকার, এটাও জানে না, যার স্বামী বনে থাকে সে মরিচ পোড়াতে পারে না!
শাশুড়ির কথা শুনে ভয়ে মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেলো রাধারানীর, কথাটা তো সে জানতো! কিন্তু ক্ষুধার পেটে কেমন করে ভুলে গিয়েছিলো তাই ভেবে দেয়ালে মাথা ঠুকতে ইচ্ছে করছে এখন। নির্বোধ পুত্রবধূর দিকে ঘৃণা নিয়ে তাকিয়ে থাকতে থাকতে শাশুড়ির চোখ গেলো ওর ভাতের থালার দিকে। আবার হুংকার ছোড়ে বুড়ি। বলে, এমন নোলা দেখিনি বাপের জন্মে। স্বামী যার এখনো বনে, বেঁচে আছে নাকি এতোক্ষণে বাঘের পেটে চলে গিয়েছে তার নেই ঠিক, উনি আবার ভাজা মাছ দিয়ে ভাত খেতে বসেছেন। ছিঃ ছিঃ ছিঃ!
এইবার মেয়েটা ঝরঝর করে কাঁদতে আরম্ভ করেছে। তাই তো! চরণ বন থেকে ফিরে না আসা পর্যন্ত সব ধরনের ভাজা-পোড়া খাওয়া বন্ধ যে তার। হায়, পরপর এতো ভুল করে ফেলা, মা বনবিবি ক্ষমা করবে তো তাকে! ক্ষুধার্ত শিশুকে দুধ খাওয়ানোর কথা বেমালুম ভুলে সে ছুটে গেলো মণ্ডপের দিকে। মা বনবিবির পায়ে মাথা, শীতের ঋতুতে অকল্পনীয় আষাঢ়ের মেঘের মতো ঝরঝরিয়ে কাঁদতে আরম্ভ করলো। ফোঁপাতে ফোঁপাতে বলে, রক্ষা করো মা। রক্ষা করো আমার স্বামীকে। রক্ষা করো তুমি আমাদের সবাইকে!
পরের দিনগুলো রাধারানী, শাহিদা আর বুলি দাসী পরস্পরের নিকটাত্মীয়ের মতো দিনের প্রায় বেশিরভাগ সময় একসাথে কাটায়। সংসারের কাজকর্ম সেরে একটুখানি ফুরসত পেলেই দৌড়ে আসে একে অপরের কাছে। সিঁদুরে সিঁথি আর ঘোমটা দেওয়া মাথা, দুই কপালের মুখেই রাজ্যের আতঙ্ক চেপে বসেছে। একটি একটি দিন যাচ্ছে আর যেন একটি একটি বছর পার হয় তাদের। সধবা তিনজন বারেবারে ভাবে একই গ্রামে আলাদা করে রাখা বিধবা পাড়ার নারীদের কথা। অসহায় বিধবাগুলোও তো একদিন তাদেরই মতো সধবা ছিলো। তাদেরও স্বামী ছিলো। কিন্তু স্বামীকে বাঘে খাওয়ার পর তারা পরিবার থেকে বহিষ্কৃত হয়েছে স্বামী-খেকো অপবাদ নিয়ে। সমাজের কোথাও জায়গা হয় না এদের। অপয়া, অলক্ষী, অচ্ছুত বলে বিবেচিত হয় সবার কাছে। গ্রামের সবাই বিশ্বাস করে, বাঘের পেটে স্বামী তো আর এমনি এমনি যায় না, যায় স্ত্রীর দোষে! তেমন গুণলক্ষী স্ত্রীর স্বামীকে বাঘে খাবে, এতো সাহস আছে কোন দুনিয়ার কোন জঙ্গলের বাঘের?
এইসময় পাশ দিয়ে হেঁটে যাওয়া তাপস কেশে গলা পরিষ্কার করে। বলে, ভাইরা ফিরেছে নাকি জঙ্গল থেকে? কবে ফিরবে, বলেছে কিছু?
উত্তর করে না শাহিদা। উত্তর দেয় না রাধারানী। নিরুত্তর থাকে বুলি দাসী। তিনজনের মুখ বন্ধ। কারণ স্বামী বন থেকে ফেরত না আসা পর্যন্ত তারা অন্য কোনো পুরুষের সঙ্গে কথা বলতে পারবে না। কথা বলার নিয়ম নাই। ওদের নীরবতার নিরুত্তর নিয়ে রাস্তা মাপে তাপস।
ক্রমাগত বাড়তে থাকা দুশ্চিন্তার আচ্ছন্ন উদ্বেগে তিন দিনের পর চারটি দিনও অতিবাহিত হয়ে গেলো। তিনজন নারীর তিনজন স্বামীর একজনও ফিরে আসেনি এখনও। বুলি দাসী ভাবছে, এবার হয়তো সনাতন বনের আরেকটু গভীরে প্রবেশ করেছে যেখানে মৌমাছি বড় বড় মৌচাক তৈরি করে। মধু ভরা কয়েকটা মৌচাক কেটে আনতে পারলে বাজারে ভালো দামে বিক্রি করা যাবে। অর্থলাভের সম্ভাবনার আনন্দের পাশাপাশি ভয়ও যুক্ত হতে থাকে বুলি দাসীর মনে। অস্থির হয়ে শুধু ভাবে, মানুষটা কবে বাড়ি ফিরবে!
দুই
আড়তের জমাদার দেওয়ান গাজীর ছেলের বিয়ে উপলক্ষ্যে জেলেপল্লির সবাই নিমন্ত্রণ পেয়েছে। একবেলা পেট পুরে গোস্ত ভাত খাবে। বিয়ের অনুষ্ঠানে রাধারানী এসেছে শাশুড়ির সঙ্গে। দেখতে পেল অনেকগুলো বাঘবিধবাও এসেছে নেমন্তন্ন খেতে। বুক কাঁপিয়ে দীর্ঘশ্বাস বের হয় তার। আহারে! আর সব শুভকাজের মতো বিয়ের শুভক্ষণেও উপস্থিত থাকতে পারে না বাঘবিধবারা, কারণ তারা অশুভ। আর সবার সঙ্গে বিয়ে খেতে এসেও তাদের দাঁড়াতে হয়েছে আলাদা লাইনে। তাদের খাওয়ার জায়গাও তৈরি করা করা হয়েছে একপাশে, আলাদা করে। মুর্শিদা বেগম, দীপালি দাসী, রাশিদা খাতুন-সহ আরো অনেকজন বাঘবিধবাকে দেখতে পাচ্ছে। একদিন তারা পাশাপাশি বসে খেতে পারলেও এখন আর সেটি সম্ভব নয়। এখন ওরা একই সমাজের বাসিন্দা হলেও মূলত ভিন্ন দুটি শ্রেণি। অন্যান্য সমাজবাসীর মতো বনবাসীরাও পয়া আর অপয়া চিহ্নিত করে নারীর মাথার তাজ স্বামীর জীবনকাল দিয়ে।
বাল্যবান্ধবী দীপালি দাসীকে দেখে মন চঞ্চল হলো রাধারানীর। দীপালির স্বামী তাপস বাঘের কামড়ে মারা যাওয়ার পর, সে বাবার বাড়ি আর শ্বশুর বাড়ি কোথাও ঠাঁই পায়নি। তিনটা মেয়ে নিয়ে দীপালি এখন নদীতে রেণু পোনা ও কাঁকড়া ধরে সংসার চালায়। রাধারানীকে দেখেই দীপালি হুট করে লুকিয়ে পড়েছে আরেকজনের পেছনে। দেখা দিতে চায় না বুঝতে পেরেও রাধারানী নিজে গিয়ে মুখোমুখি হলো দীপালির। বললো, কিরে তুই আমাকে দেখে পলাচ্ছিলি কেন?
অযথাই দীপালি তার গায়ে প্যাঁচানো নোংরা শালের কোনা ধরে টানতে থাকে। তারপর, চিরদিন তুই সম্বোধন করে আসা বান্ধবীকে আপনি সম্বোধন করে। বলে, আমি বাঘবিধবা, আমার সঙ্গে কথা কলি আপনার স্বামীর ক্ষতি হতি পারে। এখানে আমরা যে’কটা বাঘবিধবা আছি আমরা অনেক কষ্ট পেইয়েছি— ভাতের কষ্ট পেইয়েছি, কাপড়ের কষ্ট পেইয়েছি, পানির কষ্ট পেইয়েছি, জাগার কষ্ট পেইয়েছি, না খাইয়ে না দেয়ে দিন কাটিয়েছি; আপনি আমার সঙ্গে কথা বলছেন দেখলে সবাই কবে, ও স্বামী খাওয়া; ওর স্বামী মইরেচে, ও অপয়া, ও অলক্ষ্মী; তাই আপনাকে দেখে পলাচ্ছিলাম।
পাঁচদিনের দিন সন্ধ্যার আগে আগে গ্রামে হইচই শোনা গেলো। বনে যাওয়া মানুষগুলো ফিরে এসেছে। দৌড়ে ঘর থেকে বের হলো বুলি দাসী। সনাতনকে সুস্থ শরীরে চোখের সামনে দেখতে পেয়ে মাটিতে মাথা ঠেকিয়ে প্রণাম জানায় মা বনবিবি আর যত ঠাকুর দেবতার পায়ে। ছুটে এসেছে শাহিদা। মাথা নিচু করে রমিজকে হেঁটে আসতে দেখে শাহিদা ডুকরে কেঁদে ওঠে। শব্দ করে বললো, আলহামদুলিল্লাহ, খোদার অশেষ রহমত! ছেলেকে শাশুড়ির কোলে রেখে দৌড়ে এসেছে রাধারানীও। বুকের ভেতর উথালপাথাল আনন্দ। স্বামী ফিরে এসেছে বন থেকে! ঠিক করে রেখেছে চরণকে আজ জিজ্ঞেস করবে রয়েল বেঙ্গল টাইগারের চোখের মণি কোন রঙের হয়! রাধারানীর আনন্দিত মুখের দিকে তাকিয়ে চুপ করে থাকে সনাতন আর রমিজ। তা আমার মানুষটা কোথায়! অস্থির কণ্ঠে সে জিজ্ঞেস করলো। চারপাশে জমে যাওয়া পল্লীবাসীর ভিড়ে রাধারানীর দুই চোখ তার স্বামীকে খুঁজছে। ছোটোখাটো শরীরের শক্ত পোক্ত গড়নের মানুষটা এক হাতে একটা বাঘের গলা টিপে মেরে ফেলতে পারবে বলেই তার বিশ্বাস।
চরণ ভাইরে বাঘে খেয়েছে, সংবাদ জানালো রমিজ।
মুহূর্তে চারপাশের ফিসফাস বন্ধ হয়ে গেলো, শুধু রাধারানীর বুকের ওঠানামার শব্দ শোনা যেতে থাকে। অপলক চোখে অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে সে একবার তাকালো রমিজের দিকে আরেকবার সনাতনের দিকে। হিংস্র কণ্ঠে বললো, তাহলে আপনেরা বাঁইচ্যা আছেন কীভাবে? বাঘ কি আপনাগো চোখে দেখেনি, শুধু তারেই দেইখেছে!
রাধারানীর বিলাপ আর আর্তনাদে ভারী হয়ে গেলো জেলেপল্লির বাতাস, সুন্দরবন থেকে কেটে আনা গোলপাতার স্তূপ, বালতি ভর্তি রসে টুসটুস মৌচাকের ওজন বেশি লাগতে থাকে। কেউ কেউ সান্ত্বনা দিচ্ছে রাধারানীকে। কেউ তার মাথায় হাত বুলাচ্ছে। কারা যেন হাত ধরে টেনে ওকে বাড়িতে নিয়ে এলো শাশুড়ির সামনে। জীবিত থেকেও যেন একটা প্রাণহীন দেহ রাধারানী। বাড়ির উঠোনে পা রাখতেই শুনতে পেলো শাশুড়ির চিৎকার, বুক চাপড়াতে চাপড়াতে বলছে, ওই মাইয়ে একটা ডাইনি। আমার ছেলেরে বাঘের পেটে দিয়েছে। ওরে আমি রাইখবো না। এক্ষুনি দূর হয়ে যা, তুই অলক্ষুনে!
মাটিতে নেতিয়ে পড়লো রাধারানীর দেহ। উঠোনের একপাশে স্তূপ হয়ে থাকা একতাল মানব বিষ্ঠা যেন। অচ্ছুত কলঙ্ক সে এই বাড়ির। এরপর আর কিছু মনে নেই তার। আধা চৈতন্যে ছেলেকে কোলে নিয়ে শ্বশুর বাড়ি থেকে দাদার বাড়ি গিয়ে পৌঁছালো। শরীর চলতে না চাইলেও বাচ্চার কথা ভেবে মায়ের শরীর শক্তি পেয়েছে, সেও এক অলৌকিক ইঙ্গিতের খেলা যেন। ছেলেকে বাঁচাতে হবে। কারণ, এই ছেলে রাধারানীর জীবনে চরণের শেষ স্মৃতিচিহ্ন।
প্রথমদিকে দাদা আর বৌদির আচরণে কিছুটা সহানুভূতি দেখা গেলেও ধীরে ধীরে রাধারানী বুঝতে পারে এখানেও তার বেশিদিন থাকা হবে না। একসময় দাদার অকথ্য গালাগাল আর বৌদির নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে ছেলেকে নিয়ে সে আশ্রয় নিলো বিধবাপল্লিতে। জীবন বাঁচিয়ে রাখতে শুরু করেছে নদীতে জাল টানা ও অন্যের বাড়িতে ঝিয়ের কাজ। চরণ বেঁচে থাকতেও যে খুব সচ্ছল জীবনের স্বাদ পেয়েছিলো সে তা না, কিন্তু স্বামী থাকা মানে শিরদাঁড়া সোজা করে হাঁটা, তাতে পেটে পিঠে অন্ন বস্ত্র থাক বা না থাক। রাধারানীর দাদি বলতো, মেয়েমানুষ লতানো গাছ। তাই একটা খুঁটি, মানে একটা পুরুষমানুষ সবসময় পাশে থাকা দরকার।
তিন
চরণের মৃত্যুর পরে আরো তিনটি বছর পার হয়েছে। আজকাল রাধারানী তার জীবনে একজন পুরুষমানুষের অভাবে কাতর হয়। তাছাড়া সামনে পড়ে থাকা দীর্ঘ জীবনের ভার দুঃসহ লাগতে আরম্ভ করেছে আরো আগে থেকেই। কিন্তু একে সে বাঘবিধবা, তার উপরে দেখতে তেমন সুশ্রীও নয়, কোন পুরুষটি আকৃষ্ট হবে ওর প্রতি! তবে, হয়তো, রাধারানীর ভাগ্য, চরণের ছোটভাই বিজন আসা যাওয়া করতে আরম্ভ করেছে তার কাছে। প্রথমে সেটি ছিলো ভাতিজার উছিলা। এরপর সরাসরি কারণ হয়ে উঠলো রাধারানী নিজেই। আর সেও বিজনকে আসতে নিষেধ করে না। কীভাবে সে বিজনকে নিকটবর্তী হতে নিষেধ করতে পারতো! কতোদিন আর সে অন্যের বাড়িতে ঝিয়ের কাজ করবে! তাছাড়া ছেলেটার আপন কাকু, বাবার মতোই বৈকি। তবে, রাধারাণীর ভাগ্য সুপ্রসন্ন ছিলো, কয়েক বছরের ব্যবধানে সে দ্বিতীয়বার বৌ হয়ে এলো, একই বাড়িতে। এবারে ছোটছেলে বিজনের স্ত্রী হিসেবে।
শাশুড়ির পছন্দ না হলেও নাতি আর ছোটছেলের কারণে মেনে নিয়েছে তাকে। ছোট নাতিটা যখন ভাঙা ভাঙা উচ্চারণে ঠাম্মার গলা পেঁচিয়ে ঘন জঙ্গলের মস্ত বাঘের গল্প শোনায়, বুড়ি তখন নাতির মাঝে হারিয়ে যাওয়া ছেলে চরণকে দেখতে পায়, আর তার কুঁচকানো গালের খাঁজ বেয়ে গড়িয়ে নামে টলটলে জলের ধারা।
কয়েক বছর আগের মাঘ মাস ফুরিয়ে গেছে। এখন বর্ষা এসেছে। ঋতু পরিবর্তনের মতো মানুষের জীবনেও সুখ আর দুঃখ আসে পালা বদল করে। বেঁচে থাকার লড়াইয়ে টিকে গিয়ে বিজনের স্ত্রী রাধার জীবন আবার ফিরে পেয়েছে বেঁচে থাকার স্বাদ। সংসারের মায়া ওর ত্বকে আবার ফুটিয়েছে সুখের আভা। বিজনের স্পর্শে উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে ওর দুই চোখের মণি। অবশেষে মেয়েটা স্বামী সন্তান নিয়ে সুখে ও শান্তিতে দিন কাটাতে লাগলো, ছোটবেলার রূপকথার গল্পের মতো। আমাদের এই গল্পটার সমাপ্তি হতে পারতো— যেখানে বিজন জীবিকার সন্ধানে সুন্দরবনে যাওয়ার বদলে অন্য কোনো পেশায় যুক্ত হতে পারতো, তারা গ্রাম ছেড়ে মফস্বলের কোথাও ঘর নিতে পারতো, ঘরের কাজের পাশাপাশি রাধা নিজেও কিছু রোজগারের ব্যবস্থা করতে পারতো, বিজনের ও রাধার সম্মিলিত একটা দুটো অথবা আধা ডজন সন্তান জন্ম নিতে পারতো; এমন অনেক সম্ভাবনাই অবাস্তবায়িত থেকে গেছে, কারণ বিজন ও রাধা যেখান থেকে শুরু করেছিলো সেখানেই থেকে গেছে, আর রাধারানীর কপালে এই সুখও সইলো না বেশিদিন। কারণ জীবনের রঙ্গমঞ্চে কখনো কখনো একই বুকভাঙা ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটে। সমান যন্ত্রণায় পাঁজর গুড়িয়ে যায় কোনো কোনো জীবন্ত মানুষের, বারবার। দুঃখের দিন শেষ হয়েও শেষ হয় না তাদের। চরণের মতো বিজনও বনে মাছ ধরতে গিয়ে বাঘের পেটে খাবার হলো যেদিন, সেদিন, ঠিক সেই মুহূর্ত থেকেই হয়তো রাধার কপালের সিঁদুর দ্বিতীয়বার মুছে যাওয়ার মাধ্যমে এই জন্মের মতো সমাপ্ত হয়ে গেলো তার স্বাভাবিক মানুষের মতো জীবনযাপন করার যাবতীয় অধিকার। দুটি জোয়ান ছেলে হারানো মা তার শোকের জন্য দায়ী করতে পারে শুধু একজনকেই— সৃষ্টিকর্তাকে দায়ী করার সাহস হয় না তার মনে, সব দোষ ওই অভিশপ্ত মাগীটার, পরপর দুই ছেলের মৃত্যুর জন্য দায়ী একজনই, একই নারী, রাধারানী।
ঘৃণা আর বিরক্তির অসহ্য তিক্ত রস গলায় নিয়ে শাশুড়ি অপেক্ষা করতে থাকে শোকের কয়েকটা দিন পার হলেই বৌকে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেবে। তার স্বামীদের মতো সেও জঙ্গলে চলে যাক, বাঘের পায়ে ধরুক তাকেও পেটে ঠাঁই দেওয়ার জন্য। শুধু নাতিটা তার ঠাম্মার কাছে বড় হতে পারবে। শাশুড়ি প্রতিজ্ঞা করেছে নাতিকে সে এমন শক্তিশালী জওয়ান বানাবে, বড় হয়ে বাবা ও কাকুর হত্যার প্রতিশোধ নিতে বনে গিয়ে অন্তত দুইটা বাঘ সে মারবেই মারবে।
কিন্তু শোকের সময় পার হয়ে গেলেও রাধারাণীকে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দিতে পারলো না শাশুড়ি। কারণ, পল্লীবাসীর ভয়ে। কারণ, পল্লীর সবার কাছে রাধারানী এখন একটা উচ্চারণ অযোগ্য অশুভ অপয়া নাম। ততোদিনে রাধারানীকে নিয়ে গ্রামের মানুষের মুখে মুখে ঘুরতে আরম্ভ করেছে নানান কল্পিত গল্প। একদিন, কেউ রাধারানীকে খালি কলস নিয়ে আসতে দেখেছিলো বলে সেদিন তার বাপু জঙ্গলে ঢোকা মাত্রই বাঘের পেটে গিয়েছে। আরেকদিন, কেউ যাত্রা আরম্ভ করার মুখে রাধারানীকে একপলক দেখেছিলো বলে শুকনো রাস্তায় পা পিছলে পড়ে গিয়ে কোমর ভেঙেছে। অন্যদিন, নদীতে স্নান করতে যাওয়ার সময় পেছন থেকে রাধারাণীর ডাক শুনে ফিরে তাকিয়েছিলো বলে কারো কাঁখের কলসে তৎক্ষণাৎ চিড়চিড় শব্দে ফাটল ধরে গিয়েছিলো। এই রকম আরো কিছু কল্পিত ও ভৌতিক গল্প রটে গেছে আশেপাশের কয়েকটা এলাকা জুড়ে। মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়েছে একটা অন্ধ বিশ্বাস, রাধারানীর মুখ দেখে যার দিন শুরু হবে, তার দিন ভয়াবহ দুর্যোগপূর্ণ যাবে।
আর এসবের ফলাফল যা হলো তা বোধহয় কেবল তার শাশুড়ির জন্যেই বিপদ হয়ে এলো। পুত্রবধূকে সে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দিতে পারছে না, পল্লীর সবার কড়া নজর পড়ে থাকে তাদের বাড়িটার দিকে, চোখে পাহারা না দিলেও সজাগ কানে কেউ না কেউ প্রতি মুহূর্তেই নজরদারি করছে তাদের ওপর। রাধারানী এখন আর বাড়ির উঠোনের বাইরে পা ফেলে না। সমস্ত দিন ঘরের কাজ সেরে রান্না করে বাসন মেজে ঘর আর উঠোন ঝেড়ে ছেলেকে খাইয়ে নাইয়ে ঘুম পাড়িয়ে নিজের মুখে কিছু খাবার ঠেসে দিয়ে ক্লান্ত শরীরে কাঠের চৌকিতে গা ছোঁয়াতেই ঘুমে ঢলে পড়ে। দিনের কর্মক্লান্তি তার রাতের ঘুমকে ত্বরান্বিত করেছে। রোজকার নিয়ম মতো এখন সে সন্ধ্যার পরপরই শাশুড়িকে ডেকে বলে, মা, আমার পায়ের শিকলটা বেঁধে দিয়ে যান, আমি ঘুমাবো।
দুই ছেলেকে হারিয়ে আর পিশাচিনী পুত্রবধূকে বাড়িতে রেখে পেলে পাহারা দিতে দিতে বুড়িও অল্প সময়ের মধ্যে দ্বিগুণ-তিনগুণ-কয়েকগুণ বেশি দুর্বল হয়ে গেছে। শাশুড়ির শরীরে আগের মতো শক্তি নেই, তবু, এখনও সে পুত্র-বধূর সঙ্গে ঠিকই পেরে ওঠে। রাধারানীর দুইপায়ে শিকল পেঁচিয়ে চৌকির পায়ের সঙ্গে একটা তালা লাগিয়ে দেয়, তারপর নাতিকে সঙ্গে নিয়ে ঘুমাতে যায় নিজের ঘরে। দুশ্চিন্তায় আর আক্রমণের ভয়ে শাশুড়ি ঠিকমতো ঘুমাতে পারে না সারারাত। অথচ মেয়েটার যেন কিচ্ছুটি ভ্রূক্ষেপ নেই। কোনো কোনো রাতে একটিবার চোখ বন্ধ করলে সকালের আগে কিছুই টের পায় না আর। স্বপ্নহীন নিরুপদ্রব কেটে যায় রাধারাণীর বরিষণমুখর আস্ত বর্ষারাত। অবশ্য, কোনো কোনো রাতে সামান্য ঝামেলা করে ওরা। কখনো চরণ। আবার কখনো বিজন। কখনো অনভিজ্ঞ বিজন নিজেকে সমর্পণ করে অভিজ্ঞ রাধার হাতে, রাধার নির্দেশিত পথে এগিয়ে চলে ফুল বিছানো মধুকুঞ্জের চূড়ায়। আবার কখনো স্বপ্নে আসে তার প্রথম স্বামী, চরণ, যাকে সে সত্যিই একমাত্র স্বামী বলে মনে করে, সে এলেই খুব করে সোহাগ করে, ঠিক সেই শেষের রাতের মতো, বনে মাছ ধরতে যাওয়ার আগের রাতে যেভাবে সে নিজেকে নিংড়ে সোহাগ দিয়ে গিয়েছিলো তাকে। আর অপার্থিব সোহাগের খেলা শেষ হওয়ার পরে চরণের হাত যায় স্ত্রীর চরণে। আশ্চর্য হয়ে প্রশ্ন করে, তোমার পায়ে শিকল কেন বৌ? তোমার পায়ে শিকল পরাইছে কে?
স্বপ্নের রাধারানী স্বামীর কথায় অবিকল সেই প্রথম যৌবনের দিনগুলোর মতো হেসে গলে পড়ে, পান খাওয়া মুখের কষ জিভে চেটে বলে, আমার শাশুড়ি গো, আমার শাশুড়ি, শাশুড়ি আমাকে শিকল দিয়ে বেঁধে রাখে।
কেন? ঠিক এরপরেই সে বিজনের আশ্চর্যভরা কণ্ঠ শুনতে পায়। তার দ্বিতীয় স্বামী প্রশ্ন করেছে, জানতে চাইছে রাধার মুক্ত দুইপায়ে শিকল লাগিয়েছে কে? কারা? এ যে বড়ই অনুচিত কাজ হয়েছে!
রাধারানী হা হা হাসে। সহজে কথার জবাব দেয় না সে। আপনমনে মাথা নাড়তে থাকে শুধু, একবার সামনে, আবার পেছনে। অনেক বছর আগে সেই এক মাঘের কুয়াশা মোড়ানো সকাল শুকিয়ে কতো ফাল্গুন চৈত্র বর্ষা এলো আর গেলো, রাধার শরীরে প্রাণের স্পন্দন তবু একই রকম নিভু নিভু করে জ্বলছে। উচিত আর অনুচিতের পার্থক্য করার চেষ্টা সে ছেড়ে দিয়েছে সেই কবে! চরণ যেমন বলতো, সুন্দরবনের কাদামাটিতে মাছগুলা খালি গুত্তা মারে, ধরে ফেলা মাছও গা মুচড়ে পিছলে বেরিয়ে যায় জেলের বলবান মুঠি থেকে; রাধারানীও সেইরকম, পিছলায়, পিছলায় আর শরীর মুচড়ে অপ্রকৃতস্থের মতো রহস্যময় হাসি হাসে। জেলেপল্লির একটা মাটির ঘরে পাতলা তোষক বিছানো শক্ত চৌকিতে গা এলিয়ে থাকা একটা বাঘবিধবার মুখে যেসব কথা বেমানান, যেসব অভিযোগ অতি অশোভন, যা কিছু উদ্ধত উচ্চারণ, তাই উচ্চারিত হতে থাকে রাধারাণীর মুখ থেকে, সশব্দে। ফিসফিস করে স্বামীকে বলে, আমি যে অপয়া গো, আমি তো জন্ম-অলক্ষী, আমি ভাতার-খেকো, আমি ডাইনি! আর কতো নামে ডাকবে তোমরা আমাকে। তারচেয়ে একবারে পাথর ছুড়ে মেরে ফেলো না কেন। আমার এই জীবন তো মৃত্যুর মতোই। স্বামী গেলো বাঘের পেটে, আমাকেও মেরে রেখে গেলো কতোগুলা বাঘের মুখে।
স্বপ্নের-স্বামী স্বপ্নে মিলিয়ে গেছে কখন, তবু বাস্তবের জগতে ঘুমের ঘোরে, অথবা ক্ষুধার যন্ত্রণায় অপ্রকৃতস্থের মতো সুর করে বিলাপ করে চলে বাঘবিধবা রাধারানী। রাতের অন্ধকারে বাইরের জগতে ভূতুড়ে আওয়াজের জীবজন্তুরা যখন নিজেদের ভেতরে কথাবার্তা চালাচালি করছে, ঘরের ভেতরে দরজার বাইরে তালা আর চৌকির পায়ার সাথে শিকল প্যাঁচানো নিরাপত্তার ভিতরে তখন একটি নারী বুকের দীর্ঘশ্বাস মিশিয়ে দিতে থাকে শব্দহীন অসহায় কান্নার সাথে। আশ্রয় খুঁজছে তার ‘কেউ না থাকা আপন’ কারো কাছে। কিন্তু কোথাও শরণ না পেয়ে সে খরখরে বেসুরো গলায় গুনগুন করে গেয়ে যাচ্ছে শৈশবে শুনতে শুনতে বড় হওয়া একটা প্রার্থনাগীতি:
“রাত দুপুরে ঘরের চালে প্যাঁচায় দেলে ডাক
বেনবেলা কেন মাথার পরে কা কা করে কাক।
শোনো তুমি মা বনবিবি বলি গো তোমারে
অভাগিনি শরণ নেলে তোমারই চরণে,
ওমা তোমারই চরণে…"
পহেলা মাঘ, ১৪৩০। দক্ষিণ বাংলার শ্যামনগরের জেলেপল্লিতে শুরু হয়েছে লোকসংষ্কৃতির একটি উপাচার মা বনবিবি পূজা। এই পূজায় প্রধান, মা বনবিবি। গত একটি বছর ধরে মণ্ডপে দাঁড়িয়ে থাকা মাকে নৌকায় তুলে গভীর জঙ্গলে নিয়ে যাচ্ছে গ্রামের পাঁচ ছয়জন পুরুষ। সেখানে বিসর্জন দিয়ে আসা হবে পুরাতন মাকে। পাশাপাশি মণ্ডপে বসানো হচ্ছে নতুন মা বনবিবিকে। নৌকা নিয়ে মানুষগুলো ফিরে আসলেই আরম্ভ হবে উপাসনা। জেলেপল্লির মেয়ে, ছেলে, বুড়ো, খোঁড়া, রোগগ্রস্ত, পাগল, আধ পাগল-মোটকথা পল্লীর অপয়া কয়েকশত বিধবাগুলো ছাড়া বাকি সবাই মণ্ডপের চারপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। রাধারানী, শুক্লা আর পরেশ মণ্ডপের জন্য লেপে রাখা জায়গাটুকুতে দাঁড়িয়ে অতি সতর্কতায় বসাচ্ছে একে একে শাহ জঙ্গলি, ধনা, মনা, গাজী কালু, দুঃখে, সুন্দরবনের বাঘের মূর্তি দক্ষিণ রায় আর এদের সবার মধ্যখানে মা বনবিবিকে। মণ্ডপের সামনে গতরাতে পুঁতে দেওয়া কলাগাছ দুটির একটি খানিকটা কাত হয়ে পড়েছে লক্ষ্য করে রাধারানী চেঁচিয়ে ওঠে, এই যে শ্যামল মিয়াভাই, কলাগাছ তো বাঁকা হয়েছে। কী অলক্ষুনে কথা!
মধ্যবয়সি মৌয়াল শ্যামলের গায়ে শীত সকালেও শুধু একটা স্যান্ডো গেঞ্জি। গালের ডান পাশে আর উদোম দুই হাতের কয়েকটি স্থানে ছোট বড় খাবলা খাবলা গর্ত। কয়েক বছর আগে বনের ভেতরে মধু সংগ্রহ করতে গিয়ে বাঘের শিকার হয়ে হয়েছিলো সে। মরে যাওয়ারই কথা ছিলো, কিন্তু মা বনবিবির কৃপায় প্রাণ নিয়ে ফিরে এসেছে। শুক্লার কথা শুনে কলা গাছের দিকে তাকিয়ে দেখে সত্যি ওটা পুব দিকে বাঁকা হয়ে আছে। দুই হাতে দুই কান ছুঁয়ে জিভে কামড় দিয়ে শ্যামল বলে, সহায় সহায় মা বনবিবি, বাঁচাও আমাদের তুমি। কলা গাছ দুইহাতে জড়িয়ে ধরে সোজা করে দিলো। কিছুক্ষণ পর বললো, বেলা বেড়ে যাচ্ছে, নৌকা নিয়ে তারা ফিরলো বলে, পুথি পাঠ আরম্ভ হবে, আশা করছি এই বচ্ছর মায়ের কৃপায় আমাদের গ্রামে কোনো বাপের ব্যাটা বাঘের পেটে খাবার হবে না।
রাধারানীর স্বামী চরণ সর্দার আগে কৃষিকাজ করতো। কিন্তু একসময় কৃষি জমিতে লবণ পানি তুলে চিংড়ি চাষ আরম্ভ হলে ধীরে ধীরে চিংড়ির ঘের বাড়তে থাকে। কাজ হারায় চরণ। সেই থেকে সে সুন্দরবনে যায় মাছ ধরতে। রাধারানীর বুক কাঁপে ভয়ে, স্বামীকে জঙ্গলে পাঠাতে ইচ্ছে করে না। কিন্তু পেটের ক্ষুধা মাঘের কুয়াশায় লুকিয়ে থাকা অজানা রাক্ষসের ভয়ের চেয়েও ভয়ংকর। তাই যেতে দিতে হয় স্বামীকে। তবুও তার কানে বাজে বিধবা আন্দরি বালার বিলাপ ধ্বনি— বাপেরেও খেলো বাঘে, ভাইয়েরও খেলো বাঘে, স্বামীরেও খেলো বাঘে!
না, এতো ভয় পেলে চলবে না রাধারানীর। পেটে দানা পানির জোগান দিতে হবে আর কোলের ওপর বড় হচ্ছে যে সন্তান, তার জন্যেও তো ভাবতে হবে। মণ্ডপে মূর্তি বসানো আর সাজসজ্জার বাদবাকি কাজ শেষ হবার আগেই পুরুষ লোকগুলো হইহই করে নৌকা ঘাটে লাগিয়েছে। মা বনবিবিকে জঙ্গলের গভীরে বিসর্জন দিয়ে আরম্ভ হয়েছে নতুন মায়ের উপাসনা। ঢাকের শব্দ, উলু ধ্বনি, উৎফুল্ল মানুষের নাচ আর কলকল হাস্যরসে জেলেপাড়া মুখরিত থাকবে আগামী ছয় দিন।
রাধারানীর ছেলের বয়স এক মাস। ওর স্বামী চরণ যাবে সুন্দরবনে মাছ ধরতে। গ্রামের আরো কয়েকজন পুরুষ একসাথে যাবে। তাদের কেউ বাওয়াল- যাবে গোলপাতা কাটতে, কেউ মৌয়াল- যাবে মধু আহরণ করতে, আর কেউ চরণের মতো জেলে- যাবে মাছ আর কাঁকড়া ধরতে। রাতে কুঁজো বুড়ির মতো গুটিয়ে থাকা কালো আর তেলচিটচিটে কুপির চারপাশে জাঁকিয়ে বসা ফ্যাকাশে অন্ধকারে ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদে সে। চরণ বলে, কান্দো কেনো রাধা?
শাড়ির আঁচলে চোখের জল মুছে রাধারানী বলে, আমার ভয় লাগছে, জাদু যদি তোমারে আর দেখতে না পায় কোনোদিন!
কথা শেষ করেই মুখে হাত চাপা দিলো সে। টুকরো করে একটা কামড় দেয় জিভে, হায় মা বনবিবি, ক্ষমা করে দাও। এ আমি কী কথা উচ্চারণ করে ফেললাম!
স্ত্রীর আক্ষেপ দেখে মুচকি হাসে চারণ। বলে, ধুর, কিচ্ছু হবে না। খামোখা ভয় পাস তুই।
তবু, স্ত্রীর বুক কাঁপে স্বামী হারানোর ভয়ে। জানে, এই মুহূর্তে শত কাঁদলেও সকালে নিজ হাতেই সে এগিয়ে দেবে স্বামীর ধুতি আর একটিমাত্র পরিষ্কার শার্ট। ঘুমানোর আগে চরণ রাধারানীকে একটু বেশি সোহাগ করলো আজ। সোহাগের উষ্ণতায় রাধারানী টের পায় তার মনের মধ্যে বিনিদ্র জেগে আছে যে ভয়ের দানব, সেটা চরণকেও আতঙ্কে রেখেছে। যদিও চরণ মুখে বলে ভিন্ন কথা। রাধাকে শোনাতে নাকি নিজেকেই শোনাতে বললো, মদ্যি মদ্যি আমার বাঘ দেখলে ভয় করে নারে রাধা, বাঘ আমারে খাবে না আমি জানি।
পরদিন সকালে পান্তা আর বাসি তরকারি খেয়ে বনের উদ্দেশ্যে যাত্রা করে চরণ। চরণের সঙ্গে রওনা দিয়েছে রমিজ ও সনাতন। রাধারানীর মতো বাকি দুই বৌ-ও পথের পাশে দাঁড়িয়ে থাকল যতক্ষণ তাদের পুরুষদেরকে হেঁটে যেতে দেখা যায় জঙ্গলের দিকে। সদ্য বিবাহিতা শাহিদা খাতুন জিজ্ঞেস করে, তারা কতোদিন জঙ্গলে থাকবে বুবু?
পাশের একজন উত্তর দেয়, এই ধরো গিয়ে চাইর পাঁচ দিন। ডরাও না, তোমার স্বামী এইবার একটা শক্তিমান বাঘ হয়ে তোমারে আঁচলে ফিরে আসবে। ঠাট্টা করতে ছাড়ে না উত্তরদাতা মহিলা।
হুম। আসবেই তো। নিশ্চয় আসবে। লাল হয়ে ওঠা গালে বিড়বিড় করে সলজ্জ কণ্ঠে বলে শাহিদা।
দলের মধ্যে সবচেয়ে বয়স্কা বুলি দাসী রাধারানীকে ধমকের সুরে শাসায়। বলে, এই যে রাধারানী, মাথার চুল এমন বাতাসে নাচিয়ে বেড়াচ্ছ যে খুব। জানো না এতে বাঘের চোখ তোমার স্বামীর দিকে পড়বে সবার আগে?
বুলি দাসীর কথা শেষ হবার আগেই দ্রুত হাতে চুলে খোঁপার গিঁট আটে রাধারানী। শাড়ির আঁচল তুলে মাথার চুল যতখানি সম্ভব ঢেকে ফেললো। এরপর অকারণ ভয়ার্ত চোখে একবার তাকালো চারপাশে। বাকিরা ততোক্ষণে হাঁটতে আরম্ভ করেছে বাড়ির দিকে। আগামী কয়েক দিন কেমন দুশ্চিন্তায় কাটবে সেই গল্প করতে করতে তিন নারীর দলটি পথ হাঁটতে আরম্ভ করেছে। বুলি দাসী সমস্ত নিয়ম কানুনের কথা বারবার করে মনে করিয়ে দিতে থাকে অপেক্ষাকৃত অল্পবয়সি শাহিদা আর রাধারানীকে। বলে, যতদিন স্বামী ফিরে না আসছে ততোদিন তোমরা মাথার চুল আঁচড়াতে পারবে না। শরীরে আর চুলে তেল দিতে পারবে না। স্বামী যতদিন জঙ্গলে থাকবে ততোদিন খোলা চুলে চলাফেরা করা একদম মানা।
বুলি দাসীর প্রতিটি কথায় ঘাড় নেড়ে সম্মতি জানায় ওরা, কিরা কসম কেটে বলে অক্ষরে অক্ষরে পালন করবে সমস্ত নিয়ম কানুন। তবু বনে যাওয়া মানুষগুলো যেন জ্যান্ত ফিরে আসে, মনে মনে মন্ত্র পাঠ আর সূরা পাঠের মতো প্রার্থনা করতে থাকে তারা সবাই।
শাহিদাকে ওর বাড়ির উঠোন থেকে বিদায় জানানোর সময় বুলি দাসী আরো বলে, গোসল কইরলে শরীরে আবার সাবান মাখাইতে যায়ো না যেন। সাবান মাখা নিষেধ আছে। আর কোনো স্নো পাউডারও না এই কয়দিন। মনে থাকবে?
মাথা নাড়ে শাহিদা, ঠিক আছে, বুঝেছি, মনে থাকবে।
বাড়ি ফিরে রাধারানী শ্বাশুড়ির কাছ থেকে ছেলেকে কোলে তুলে নেয়। বাচ্চাটা বেশিরভাগ সময় ঘুমিয়েই থাকে। ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে রাধারানীর চোখ ভরে জল আসে। যদিও জেলেপল্লির স্বাভাবিক নিয়ম এটা, বাড়ির পুরুষেরা বনে যাবে রোজগারের ব্যবস্থা করতে। সবাই যায়। আর তাদের অনেকেই আর কোনোদিন ফিরে আসে না। কারো কারো রক্তমাখা মৃত দেহাবশেষ খুঁজে পাওয়া যায়, কেউ কেউ পুরোটাই নিশ্চিহ্ন হয়ে যায় বনের রাজার পেটে। দীর্ঘশ্বাস ফেলে রাধারানী ছেলেকে পুরোনো শাড়ি দিয়ে বানানো ছিক্কায় শুইয়ে রেখে পুকুর থেকে দুটো ডুব দিয়ে এলো। স্বামী বাড়ি না থাকলেও রাধারানীর পেটে ভীষণ খিদে মোচড় দিয়ে উঠছে। শাশুড়িকে না ডেকেই পাকের ঘরে গিয়ে ভাত খেতে বসে গেলো। বুকের দুধের বাচ্চা আছে তার, পেটে ভয়ংকর ক্ষুধার ছোবল। মাটির সরায় ঢাকনা দিয়ে রাখা পুটি মাছ ভাজা দেখে তার মন খুশিতে ঝলমলিয়ে ওঠে। একটা প্লেটে ভাত আর দুটি ভাজা মাছ নিয়ে খেতে গিয়ে মনে হলো সাথে দুটো শুকনো মরিচ পোড়া হলে বেশ হতো। মাটির চুলায় কয়লাগুলো এখনো লাল হয়ে আছে। একটা তাওয়ায় দুটো শুকনো মরিচ ফেলে নাড়তে থাকা অবস্থায় গন্ধে ছুটে এলো ওর শাশুড়ি। এক ঝটকায় চুলার উপর থেকে গরম তাওয়া ছুড়ে ফেললো। চমকে ওঠে রাধারানী। বুঝে পায় না কী এমন অপরাধ করেছে সে! শাশুড়ি রাগে চিৎকার করে ওঠে। বলে, অলক্ষুনে অপয়া কোথাকার, এটাও জানে না, যার স্বামী বনে থাকে সে মরিচ পোড়াতে পারে না!
শাশুড়ির কথা শুনে ভয়ে মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেলো রাধারানীর, কথাটা তো সে জানতো! কিন্তু ক্ষুধার পেটে কেমন করে ভুলে গিয়েছিলো তাই ভেবে দেয়ালে মাথা ঠুকতে ইচ্ছে করছে এখন। নির্বোধ পুত্রবধূর দিকে ঘৃণা নিয়ে তাকিয়ে থাকতে থাকতে শাশুড়ির চোখ গেলো ওর ভাতের থালার দিকে। আবার হুংকার ছোড়ে বুড়ি। বলে, এমন নোলা দেখিনি বাপের জন্মে। স্বামী যার এখনো বনে, বেঁচে আছে নাকি এতোক্ষণে বাঘের পেটে চলে গিয়েছে তার নেই ঠিক, উনি আবার ভাজা মাছ দিয়ে ভাত খেতে বসেছেন। ছিঃ ছিঃ ছিঃ!
এইবার মেয়েটা ঝরঝর করে কাঁদতে আরম্ভ করেছে। তাই তো! চরণ বন থেকে ফিরে না আসা পর্যন্ত সব ধরনের ভাজা-পোড়া খাওয়া বন্ধ যে তার। হায়, পরপর এতো ভুল করে ফেলা, মা বনবিবি ক্ষমা করবে তো তাকে! ক্ষুধার্ত শিশুকে দুধ খাওয়ানোর কথা বেমালুম ভুলে সে ছুটে গেলো মণ্ডপের দিকে। মা বনবিবির পায়ে মাথা, শীতের ঋতুতে অকল্পনীয় আষাঢ়ের মেঘের মতো ঝরঝরিয়ে কাঁদতে আরম্ভ করলো। ফোঁপাতে ফোঁপাতে বলে, রক্ষা করো মা। রক্ষা করো আমার স্বামীকে। রক্ষা করো তুমি আমাদের সবাইকে!
পরের দিনগুলো রাধারানী, শাহিদা আর বুলি দাসী পরস্পরের নিকটাত্মীয়ের মতো দিনের প্রায় বেশিরভাগ সময় একসাথে কাটায়। সংসারের কাজকর্ম সেরে একটুখানি ফুরসত পেলেই দৌড়ে আসে একে অপরের কাছে। সিঁদুরে সিঁথি আর ঘোমটা দেওয়া মাথা, দুই কপালের মুখেই রাজ্যের আতঙ্ক চেপে বসেছে। একটি একটি দিন যাচ্ছে আর যেন একটি একটি বছর পার হয় তাদের। সধবা তিনজন বারেবারে ভাবে একই গ্রামে আলাদা করে রাখা বিধবা পাড়ার নারীদের কথা। অসহায় বিধবাগুলোও তো একদিন তাদেরই মতো সধবা ছিলো। তাদেরও স্বামী ছিলো। কিন্তু স্বামীকে বাঘে খাওয়ার পর তারা পরিবার থেকে বহিষ্কৃত হয়েছে স্বামী-খেকো অপবাদ নিয়ে। সমাজের কোথাও জায়গা হয় না এদের। অপয়া, অলক্ষী, অচ্ছুত বলে বিবেচিত হয় সবার কাছে। গ্রামের সবাই বিশ্বাস করে, বাঘের পেটে স্বামী তো আর এমনি এমনি যায় না, যায় স্ত্রীর দোষে! তেমন গুণলক্ষী স্ত্রীর স্বামীকে বাঘে খাবে, এতো সাহস আছে কোন দুনিয়ার কোন জঙ্গলের বাঘের?
এইসময় পাশ দিয়ে হেঁটে যাওয়া তাপস কেশে গলা পরিষ্কার করে। বলে, ভাইরা ফিরেছে নাকি জঙ্গল থেকে? কবে ফিরবে, বলেছে কিছু?
উত্তর করে না শাহিদা। উত্তর দেয় না রাধারানী। নিরুত্তর থাকে বুলি দাসী। তিনজনের মুখ বন্ধ। কারণ স্বামী বন থেকে ফেরত না আসা পর্যন্ত তারা অন্য কোনো পুরুষের সঙ্গে কথা বলতে পারবে না। কথা বলার নিয়ম নাই। ওদের নীরবতার নিরুত্তর নিয়ে রাস্তা মাপে তাপস।
ক্রমাগত বাড়তে থাকা দুশ্চিন্তার আচ্ছন্ন উদ্বেগে তিন দিনের পর চারটি দিনও অতিবাহিত হয়ে গেলো। তিনজন নারীর তিনজন স্বামীর একজনও ফিরে আসেনি এখনও। বুলি দাসী ভাবছে, এবার হয়তো সনাতন বনের আরেকটু গভীরে প্রবেশ করেছে যেখানে মৌমাছি বড় বড় মৌচাক তৈরি করে। মধু ভরা কয়েকটা মৌচাক কেটে আনতে পারলে বাজারে ভালো দামে বিক্রি করা যাবে। অর্থলাভের সম্ভাবনার আনন্দের পাশাপাশি ভয়ও যুক্ত হতে থাকে বুলি দাসীর মনে। অস্থির হয়ে শুধু ভাবে, মানুষটা কবে বাড়ি ফিরবে!
দুই
আড়তের জমাদার দেওয়ান গাজীর ছেলের বিয়ে উপলক্ষ্যে জেলেপল্লির সবাই নিমন্ত্রণ পেয়েছে। একবেলা পেট পুরে গোস্ত ভাত খাবে। বিয়ের অনুষ্ঠানে রাধারানী এসেছে শাশুড়ির সঙ্গে। দেখতে পেল অনেকগুলো বাঘবিধবাও এসেছে নেমন্তন্ন খেতে। বুক কাঁপিয়ে দীর্ঘশ্বাস বের হয় তার। আহারে! আর সব শুভকাজের মতো বিয়ের শুভক্ষণেও উপস্থিত থাকতে পারে না বাঘবিধবারা, কারণ তারা অশুভ। আর সবার সঙ্গে বিয়ে খেতে এসেও তাদের দাঁড়াতে হয়েছে আলাদা লাইনে। তাদের খাওয়ার জায়গাও তৈরি করা করা হয়েছে একপাশে, আলাদা করে। মুর্শিদা বেগম, দীপালি দাসী, রাশিদা খাতুন-সহ আরো অনেকজন বাঘবিধবাকে দেখতে পাচ্ছে। একদিন তারা পাশাপাশি বসে খেতে পারলেও এখন আর সেটি সম্ভব নয়। এখন ওরা একই সমাজের বাসিন্দা হলেও মূলত ভিন্ন দুটি শ্রেণি। অন্যান্য সমাজবাসীর মতো বনবাসীরাও পয়া আর অপয়া চিহ্নিত করে নারীর মাথার তাজ স্বামীর জীবনকাল দিয়ে।
বাল্যবান্ধবী দীপালি দাসীকে দেখে মন চঞ্চল হলো রাধারানীর। দীপালির স্বামী তাপস বাঘের কামড়ে মারা যাওয়ার পর, সে বাবার বাড়ি আর শ্বশুর বাড়ি কোথাও ঠাঁই পায়নি। তিনটা মেয়ে নিয়ে দীপালি এখন নদীতে রেণু পোনা ও কাঁকড়া ধরে সংসার চালায়। রাধারানীকে দেখেই দীপালি হুট করে লুকিয়ে পড়েছে আরেকজনের পেছনে। দেখা দিতে চায় না বুঝতে পেরেও রাধারানী নিজে গিয়ে মুখোমুখি হলো দীপালির। বললো, কিরে তুই আমাকে দেখে পলাচ্ছিলি কেন?
অযথাই দীপালি তার গায়ে প্যাঁচানো নোংরা শালের কোনা ধরে টানতে থাকে। তারপর, চিরদিন তুই সম্বোধন করে আসা বান্ধবীকে আপনি সম্বোধন করে। বলে, আমি বাঘবিধবা, আমার সঙ্গে কথা কলি আপনার স্বামীর ক্ষতি হতি পারে। এখানে আমরা যে’কটা বাঘবিধবা আছি আমরা অনেক কষ্ট পেইয়েছি— ভাতের কষ্ট পেইয়েছি, কাপড়ের কষ্ট পেইয়েছি, পানির কষ্ট পেইয়েছি, জাগার কষ্ট পেইয়েছি, না খাইয়ে না দেয়ে দিন কাটিয়েছি; আপনি আমার সঙ্গে কথা বলছেন দেখলে সবাই কবে, ও স্বামী খাওয়া; ওর স্বামী মইরেচে, ও অপয়া, ও অলক্ষ্মী; তাই আপনাকে দেখে পলাচ্ছিলাম।
পাঁচদিনের দিন সন্ধ্যার আগে আগে গ্রামে হইচই শোনা গেলো। বনে যাওয়া মানুষগুলো ফিরে এসেছে। দৌড়ে ঘর থেকে বের হলো বুলি দাসী। সনাতনকে সুস্থ শরীরে চোখের সামনে দেখতে পেয়ে মাটিতে মাথা ঠেকিয়ে প্রণাম জানায় মা বনবিবি আর যত ঠাকুর দেবতার পায়ে। ছুটে এসেছে শাহিদা। মাথা নিচু করে রমিজকে হেঁটে আসতে দেখে শাহিদা ডুকরে কেঁদে ওঠে। শব্দ করে বললো, আলহামদুলিল্লাহ, খোদার অশেষ রহমত! ছেলেকে শাশুড়ির কোলে রেখে দৌড়ে এসেছে রাধারানীও। বুকের ভেতর উথালপাথাল আনন্দ। স্বামী ফিরে এসেছে বন থেকে! ঠিক করে রেখেছে চরণকে আজ জিজ্ঞেস করবে রয়েল বেঙ্গল টাইগারের চোখের মণি কোন রঙের হয়! রাধারানীর আনন্দিত মুখের দিকে তাকিয়ে চুপ করে থাকে সনাতন আর রমিজ। তা আমার মানুষটা কোথায়! অস্থির কণ্ঠে সে জিজ্ঞেস করলো। চারপাশে জমে যাওয়া পল্লীবাসীর ভিড়ে রাধারানীর দুই চোখ তার স্বামীকে খুঁজছে। ছোটোখাটো শরীরের শক্ত পোক্ত গড়নের মানুষটা এক হাতে একটা বাঘের গলা টিপে মেরে ফেলতে পারবে বলেই তার বিশ্বাস।
চরণ ভাইরে বাঘে খেয়েছে, সংবাদ জানালো রমিজ।
মুহূর্তে চারপাশের ফিসফাস বন্ধ হয়ে গেলো, শুধু রাধারানীর বুকের ওঠানামার শব্দ শোনা যেতে থাকে। অপলক চোখে অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে সে একবার তাকালো রমিজের দিকে আরেকবার সনাতনের দিকে। হিংস্র কণ্ঠে বললো, তাহলে আপনেরা বাঁইচ্যা আছেন কীভাবে? বাঘ কি আপনাগো চোখে দেখেনি, শুধু তারেই দেইখেছে!
রাধারানীর বিলাপ আর আর্তনাদে ভারী হয়ে গেলো জেলেপল্লির বাতাস, সুন্দরবন থেকে কেটে আনা গোলপাতার স্তূপ, বালতি ভর্তি রসে টুসটুস মৌচাকের ওজন বেশি লাগতে থাকে। কেউ কেউ সান্ত্বনা দিচ্ছে রাধারানীকে। কেউ তার মাথায় হাত বুলাচ্ছে। কারা যেন হাত ধরে টেনে ওকে বাড়িতে নিয়ে এলো শাশুড়ির সামনে। জীবিত থেকেও যেন একটা প্রাণহীন দেহ রাধারানী। বাড়ির উঠোনে পা রাখতেই শুনতে পেলো শাশুড়ির চিৎকার, বুক চাপড়াতে চাপড়াতে বলছে, ওই মাইয়ে একটা ডাইনি। আমার ছেলেরে বাঘের পেটে দিয়েছে। ওরে আমি রাইখবো না। এক্ষুনি দূর হয়ে যা, তুই অলক্ষুনে!
মাটিতে নেতিয়ে পড়লো রাধারানীর দেহ। উঠোনের একপাশে স্তূপ হয়ে থাকা একতাল মানব বিষ্ঠা যেন। অচ্ছুত কলঙ্ক সে এই বাড়ির। এরপর আর কিছু মনে নেই তার। আধা চৈতন্যে ছেলেকে কোলে নিয়ে শ্বশুর বাড়ি থেকে দাদার বাড়ি গিয়ে পৌঁছালো। শরীর চলতে না চাইলেও বাচ্চার কথা ভেবে মায়ের শরীর শক্তি পেয়েছে, সেও এক অলৌকিক ইঙ্গিতের খেলা যেন। ছেলেকে বাঁচাতে হবে। কারণ, এই ছেলে রাধারানীর জীবনে চরণের শেষ স্মৃতিচিহ্ন।
প্রথমদিকে দাদা আর বৌদির আচরণে কিছুটা সহানুভূতি দেখা গেলেও ধীরে ধীরে রাধারানী বুঝতে পারে এখানেও তার বেশিদিন থাকা হবে না। একসময় দাদার অকথ্য গালাগাল আর বৌদির নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে ছেলেকে নিয়ে সে আশ্রয় নিলো বিধবাপল্লিতে। জীবন বাঁচিয়ে রাখতে শুরু করেছে নদীতে জাল টানা ও অন্যের বাড়িতে ঝিয়ের কাজ। চরণ বেঁচে থাকতেও যে খুব সচ্ছল জীবনের স্বাদ পেয়েছিলো সে তা না, কিন্তু স্বামী থাকা মানে শিরদাঁড়া সোজা করে হাঁটা, তাতে পেটে পিঠে অন্ন বস্ত্র থাক বা না থাক। রাধারানীর দাদি বলতো, মেয়েমানুষ লতানো গাছ। তাই একটা খুঁটি, মানে একটা পুরুষমানুষ সবসময় পাশে থাকা দরকার।
তিন
চরণের মৃত্যুর পরে আরো তিনটি বছর পার হয়েছে। আজকাল রাধারানী তার জীবনে একজন পুরুষমানুষের অভাবে কাতর হয়। তাছাড়া সামনে পড়ে থাকা দীর্ঘ জীবনের ভার দুঃসহ লাগতে আরম্ভ করেছে আরো আগে থেকেই। কিন্তু একে সে বাঘবিধবা, তার উপরে দেখতে তেমন সুশ্রীও নয়, কোন পুরুষটি আকৃষ্ট হবে ওর প্রতি! তবে, হয়তো, রাধারানীর ভাগ্য, চরণের ছোটভাই বিজন আসা যাওয়া করতে আরম্ভ করেছে তার কাছে। প্রথমে সেটি ছিলো ভাতিজার উছিলা। এরপর সরাসরি কারণ হয়ে উঠলো রাধারানী নিজেই। আর সেও বিজনকে আসতে নিষেধ করে না। কীভাবে সে বিজনকে নিকটবর্তী হতে নিষেধ করতে পারতো! কতোদিন আর সে অন্যের বাড়িতে ঝিয়ের কাজ করবে! তাছাড়া ছেলেটার আপন কাকু, বাবার মতোই বৈকি। তবে, রাধারাণীর ভাগ্য সুপ্রসন্ন ছিলো, কয়েক বছরের ব্যবধানে সে দ্বিতীয়বার বৌ হয়ে এলো, একই বাড়িতে। এবারে ছোটছেলে বিজনের স্ত্রী হিসেবে।
শাশুড়ির পছন্দ না হলেও নাতি আর ছোটছেলের কারণে মেনে নিয়েছে তাকে। ছোট নাতিটা যখন ভাঙা ভাঙা উচ্চারণে ঠাম্মার গলা পেঁচিয়ে ঘন জঙ্গলের মস্ত বাঘের গল্প শোনায়, বুড়ি তখন নাতির মাঝে হারিয়ে যাওয়া ছেলে চরণকে দেখতে পায়, আর তার কুঁচকানো গালের খাঁজ বেয়ে গড়িয়ে নামে টলটলে জলের ধারা।
কয়েক বছর আগের মাঘ মাস ফুরিয়ে গেছে। এখন বর্ষা এসেছে। ঋতু পরিবর্তনের মতো মানুষের জীবনেও সুখ আর দুঃখ আসে পালা বদল করে। বেঁচে থাকার লড়াইয়ে টিকে গিয়ে বিজনের স্ত্রী রাধার জীবন আবার ফিরে পেয়েছে বেঁচে থাকার স্বাদ। সংসারের মায়া ওর ত্বকে আবার ফুটিয়েছে সুখের আভা। বিজনের স্পর্শে উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে ওর দুই চোখের মণি। অবশেষে মেয়েটা স্বামী সন্তান নিয়ে সুখে ও শান্তিতে দিন কাটাতে লাগলো, ছোটবেলার রূপকথার গল্পের মতো। আমাদের এই গল্পটার সমাপ্তি হতে পারতো— যেখানে বিজন জীবিকার সন্ধানে সুন্দরবনে যাওয়ার বদলে অন্য কোনো পেশায় যুক্ত হতে পারতো, তারা গ্রাম ছেড়ে মফস্বলের কোথাও ঘর নিতে পারতো, ঘরের কাজের পাশাপাশি রাধা নিজেও কিছু রোজগারের ব্যবস্থা করতে পারতো, বিজনের ও রাধার সম্মিলিত একটা দুটো অথবা আধা ডজন সন্তান জন্ম নিতে পারতো; এমন অনেক সম্ভাবনাই অবাস্তবায়িত থেকে গেছে, কারণ বিজন ও রাধা যেখান থেকে শুরু করেছিলো সেখানেই থেকে গেছে, আর রাধারানীর কপালে এই সুখও সইলো না বেশিদিন। কারণ জীবনের রঙ্গমঞ্চে কখনো কখনো একই বুকভাঙা ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটে। সমান যন্ত্রণায় পাঁজর গুড়িয়ে যায় কোনো কোনো জীবন্ত মানুষের, বারবার। দুঃখের দিন শেষ হয়েও শেষ হয় না তাদের। চরণের মতো বিজনও বনে মাছ ধরতে গিয়ে বাঘের পেটে খাবার হলো যেদিন, সেদিন, ঠিক সেই মুহূর্ত থেকেই হয়তো রাধার কপালের সিঁদুর দ্বিতীয়বার মুছে যাওয়ার মাধ্যমে এই জন্মের মতো সমাপ্ত হয়ে গেলো তার স্বাভাবিক মানুষের মতো জীবনযাপন করার যাবতীয় অধিকার। দুটি জোয়ান ছেলে হারানো মা তার শোকের জন্য দায়ী করতে পারে শুধু একজনকেই— সৃষ্টিকর্তাকে দায়ী করার সাহস হয় না তার মনে, সব দোষ ওই অভিশপ্ত মাগীটার, পরপর দুই ছেলের মৃত্যুর জন্য দায়ী একজনই, একই নারী, রাধারানী।
ঘৃণা আর বিরক্তির অসহ্য তিক্ত রস গলায় নিয়ে শাশুড়ি অপেক্ষা করতে থাকে শোকের কয়েকটা দিন পার হলেই বৌকে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেবে। তার স্বামীদের মতো সেও জঙ্গলে চলে যাক, বাঘের পায়ে ধরুক তাকেও পেটে ঠাঁই দেওয়ার জন্য। শুধু নাতিটা তার ঠাম্মার কাছে বড় হতে পারবে। শাশুড়ি প্রতিজ্ঞা করেছে নাতিকে সে এমন শক্তিশালী জওয়ান বানাবে, বড় হয়ে বাবা ও কাকুর হত্যার প্রতিশোধ নিতে বনে গিয়ে অন্তত দুইটা বাঘ সে মারবেই মারবে।
কিন্তু শোকের সময় পার হয়ে গেলেও রাধারাণীকে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দিতে পারলো না শাশুড়ি। কারণ, পল্লীবাসীর ভয়ে। কারণ, পল্লীর সবার কাছে রাধারানী এখন একটা উচ্চারণ অযোগ্য অশুভ অপয়া নাম। ততোদিনে রাধারানীকে নিয়ে গ্রামের মানুষের মুখে মুখে ঘুরতে আরম্ভ করেছে নানান কল্পিত গল্প। একদিন, কেউ রাধারানীকে খালি কলস নিয়ে আসতে দেখেছিলো বলে সেদিন তার বাপু জঙ্গলে ঢোকা মাত্রই বাঘের পেটে গিয়েছে। আরেকদিন, কেউ যাত্রা আরম্ভ করার মুখে রাধারানীকে একপলক দেখেছিলো বলে শুকনো রাস্তায় পা পিছলে পড়ে গিয়ে কোমর ভেঙেছে। অন্যদিন, নদীতে স্নান করতে যাওয়ার সময় পেছন থেকে রাধারাণীর ডাক শুনে ফিরে তাকিয়েছিলো বলে কারো কাঁখের কলসে তৎক্ষণাৎ চিড়চিড় শব্দে ফাটল ধরে গিয়েছিলো। এই রকম আরো কিছু কল্পিত ও ভৌতিক গল্প রটে গেছে আশেপাশের কয়েকটা এলাকা জুড়ে। মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়েছে একটা অন্ধ বিশ্বাস, রাধারানীর মুখ দেখে যার দিন শুরু হবে, তার দিন ভয়াবহ দুর্যোগপূর্ণ যাবে।
আর এসবের ফলাফল যা হলো তা বোধহয় কেবল তার শাশুড়ির জন্যেই বিপদ হয়ে এলো। পুত্রবধূকে সে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দিতে পারছে না, পল্লীর সবার কড়া নজর পড়ে থাকে তাদের বাড়িটার দিকে, চোখে পাহারা না দিলেও সজাগ কানে কেউ না কেউ প্রতি মুহূর্তেই নজরদারি করছে তাদের ওপর। রাধারানী এখন আর বাড়ির উঠোনের বাইরে পা ফেলে না। সমস্ত দিন ঘরের কাজ সেরে রান্না করে বাসন মেজে ঘর আর উঠোন ঝেড়ে ছেলেকে খাইয়ে নাইয়ে ঘুম পাড়িয়ে নিজের মুখে কিছু খাবার ঠেসে দিয়ে ক্লান্ত শরীরে কাঠের চৌকিতে গা ছোঁয়াতেই ঘুমে ঢলে পড়ে। দিনের কর্মক্লান্তি তার রাতের ঘুমকে ত্বরান্বিত করেছে। রোজকার নিয়ম মতো এখন সে সন্ধ্যার পরপরই শাশুড়িকে ডেকে বলে, মা, আমার পায়ের শিকলটা বেঁধে দিয়ে যান, আমি ঘুমাবো।
দুই ছেলেকে হারিয়ে আর পিশাচিনী পুত্রবধূকে বাড়িতে রেখে পেলে পাহারা দিতে দিতে বুড়িও অল্প সময়ের মধ্যে দ্বিগুণ-তিনগুণ-কয়েকগুণ বেশি দুর্বল হয়ে গেছে। শাশুড়ির শরীরে আগের মতো শক্তি নেই, তবু, এখনও সে পুত্র-বধূর সঙ্গে ঠিকই পেরে ওঠে। রাধারানীর দুইপায়ে শিকল পেঁচিয়ে চৌকির পায়ের সঙ্গে একটা তালা লাগিয়ে দেয়, তারপর নাতিকে সঙ্গে নিয়ে ঘুমাতে যায় নিজের ঘরে। দুশ্চিন্তায় আর আক্রমণের ভয়ে শাশুড়ি ঠিকমতো ঘুমাতে পারে না সারারাত। অথচ মেয়েটার যেন কিচ্ছুটি ভ্রূক্ষেপ নেই। কোনো কোনো রাতে একটিবার চোখ বন্ধ করলে সকালের আগে কিছুই টের পায় না আর। স্বপ্নহীন নিরুপদ্রব কেটে যায় রাধারাণীর বরিষণমুখর আস্ত বর্ষারাত। অবশ্য, কোনো কোনো রাতে সামান্য ঝামেলা করে ওরা। কখনো চরণ। আবার কখনো বিজন। কখনো অনভিজ্ঞ বিজন নিজেকে সমর্পণ করে অভিজ্ঞ রাধার হাতে, রাধার নির্দেশিত পথে এগিয়ে চলে ফুল বিছানো মধুকুঞ্জের চূড়ায়। আবার কখনো স্বপ্নে আসে তার প্রথম স্বামী, চরণ, যাকে সে সত্যিই একমাত্র স্বামী বলে মনে করে, সে এলেই খুব করে সোহাগ করে, ঠিক সেই শেষের রাতের মতো, বনে মাছ ধরতে যাওয়ার আগের রাতে যেভাবে সে নিজেকে নিংড়ে সোহাগ দিয়ে গিয়েছিলো তাকে। আর অপার্থিব সোহাগের খেলা শেষ হওয়ার পরে চরণের হাত যায় স্ত্রীর চরণে। আশ্চর্য হয়ে প্রশ্ন করে, তোমার পায়ে শিকল কেন বৌ? তোমার পায়ে শিকল পরাইছে কে?
স্বপ্নের রাধারানী স্বামীর কথায় অবিকল সেই প্রথম যৌবনের দিনগুলোর মতো হেসে গলে পড়ে, পান খাওয়া মুখের কষ জিভে চেটে বলে, আমার শাশুড়ি গো, আমার শাশুড়ি, শাশুড়ি আমাকে শিকল দিয়ে বেঁধে রাখে।
কেন? ঠিক এরপরেই সে বিজনের আশ্চর্যভরা কণ্ঠ শুনতে পায়। তার দ্বিতীয় স্বামী প্রশ্ন করেছে, জানতে চাইছে রাধার মুক্ত দুইপায়ে শিকল লাগিয়েছে কে? কারা? এ যে বড়ই অনুচিত কাজ হয়েছে!
রাধারানী হা হা হাসে। সহজে কথার জবাব দেয় না সে। আপনমনে মাথা নাড়তে থাকে শুধু, একবার সামনে, আবার পেছনে। অনেক বছর আগে সেই এক মাঘের কুয়াশা মোড়ানো সকাল শুকিয়ে কতো ফাল্গুন চৈত্র বর্ষা এলো আর গেলো, রাধার শরীরে প্রাণের স্পন্দন তবু একই রকম নিভু নিভু করে জ্বলছে। উচিত আর অনুচিতের পার্থক্য করার চেষ্টা সে ছেড়ে দিয়েছে সেই কবে! চরণ যেমন বলতো, সুন্দরবনের কাদামাটিতে মাছগুলা খালি গুত্তা মারে, ধরে ফেলা মাছও গা মুচড়ে পিছলে বেরিয়ে যায় জেলের বলবান মুঠি থেকে; রাধারানীও সেইরকম, পিছলায়, পিছলায় আর শরীর মুচড়ে অপ্রকৃতস্থের মতো রহস্যময় হাসি হাসে। জেলেপল্লির একটা মাটির ঘরে পাতলা তোষক বিছানো শক্ত চৌকিতে গা এলিয়ে থাকা একটা বাঘবিধবার মুখে যেসব কথা বেমানান, যেসব অভিযোগ অতি অশোভন, যা কিছু উদ্ধত উচ্চারণ, তাই উচ্চারিত হতে থাকে রাধারাণীর মুখ থেকে, সশব্দে। ফিসফিস করে স্বামীকে বলে, আমি যে অপয়া গো, আমি তো জন্ম-অলক্ষী, আমি ভাতার-খেকো, আমি ডাইনি! আর কতো নামে ডাকবে তোমরা আমাকে। তারচেয়ে একবারে পাথর ছুড়ে মেরে ফেলো না কেন। আমার এই জীবন তো মৃত্যুর মতোই। স্বামী গেলো বাঘের পেটে, আমাকেও মেরে রেখে গেলো কতোগুলা বাঘের মুখে।
স্বপ্নের-স্বামী স্বপ্নে মিলিয়ে গেছে কখন, তবু বাস্তবের জগতে ঘুমের ঘোরে, অথবা ক্ষুধার যন্ত্রণায় অপ্রকৃতস্থের মতো সুর করে বিলাপ করে চলে বাঘবিধবা রাধারানী। রাতের অন্ধকারে বাইরের জগতে ভূতুড়ে আওয়াজের জীবজন্তুরা যখন নিজেদের ভেতরে কথাবার্তা চালাচালি করছে, ঘরের ভেতরে দরজার বাইরে তালা আর চৌকির পায়ার সাথে শিকল প্যাঁচানো নিরাপত্তার ভিতরে তখন একটি নারী বুকের দীর্ঘশ্বাস মিশিয়ে দিতে থাকে শব্দহীন অসহায় কান্নার সাথে। আশ্রয় খুঁজছে তার ‘কেউ না থাকা আপন’ কারো কাছে। কিন্তু কোথাও শরণ না পেয়ে সে খরখরে বেসুরো গলায় গুনগুন করে গেয়ে যাচ্ছে শৈশবে শুনতে শুনতে বড় হওয়া একটা প্রার্থনাগীতি:
“রাত দুপুরে ঘরের চালে প্যাঁচায় দেলে ডাক
বেনবেলা কেন মাথার পরে কা কা করে কাক।
শোনো তুমি মা বনবিবি বলি গো তোমারে
অভাগিনি শরণ নেলে তোমারই চরণে,
ওমা তোমারই চরণে…"
beauty
লাইক ও মন্তব্য করতে সাইন ইন করুন।